ড. কামালের কথা শুনছে না কেউ


আজমল হক হেলাল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর এসে গণফোরামে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। সেই বিভক্তি দূর করতে দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেন নিজেও একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তাতে ফল আসেনি। সবশেষ দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন অংশ তাদের নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে এক সপ্তাহের আল্টিমেটামও দিয়েছে ড. কামালকে। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার কথা বললেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বরং দলকে একতাবদ্ধ করতে বিভিন্ন উদ্যোগই ভেস্তে যাচ্ছে। গণফোরামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠাতা ড. কামালের কথা, আদেশ বা নিষেধ— কিছুই কেউই মানছেন না।

গণফোরামের বেশকিছু নেতাকর্মীর অভিযোগ, ড. কামাল হোসেন যে আদর্শ, নীতি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে ২৭ বছর আগে গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই নীতি-আদর্শ থেকে তিনি এবং দলের অনেক নেতাকর্মীই দূরে সরে গেছেন। এ কারণে তাদের ড. কামালের নেতৃত্ব নিয়েই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে দলের মধ্যে। এর ধারাবাহিকতাতেই গণফোরামের চেইন অব কমান্ডও ভেঙে গেছে, তৈরি হয়েছে বিভাজন। একপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোস্তফা মোহসীন মন্টু, একপক্ষে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া। দুই পক্ষের নেতাদের নিয়ে আলাদা আলাদা বৈঠক করে বিরাজমান সমস্যা সমাধান করার জন্য ড. কামাল হোসেন দিলেও দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছেন।

দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিভাজন এড়াতে দুই পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে বৈঠক করার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন ড. কামাল হোসেন। কিন্তু কোনো বৈঠকে এক পক্ষ উপস্থিত থাকছে তো কোনো বৈঠকে উপস্থিত থাকছে আরেক পক্ষ। ফলে দলে বিভাজনের সীমারেখাটিও অতিক্রম করার পথ তৈরি হচ্ছে না।

দলের বিভাজন নিয়ে জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার (৮ ডিসেম্বর) ড. কামাল হোসেন সারাবাংলাকে জানিয়েছিলেন, বুধবার (৯ ডিসেম্বর) তিনি দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসবেন। সেখান থেকেই সমাধান বেরিয়ে আসবে। মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন অংশের দেওয়া আল্টিমেটাম অনুযায়ী দলের আট নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিবৃতিও আসবে। দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বুধবারের সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। ড. কামাল হোসেনও কোনো বিবৃতি দেননি।

দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ড. কামাল হোসেনের প্রতিশ্রুতিতে তারা আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ তিনি এর আগেও নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রাখেননি। আর দলের সিনিয়র একজন প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, ড. কামাল হোসেনের স্মৃতিতে বিভ্রাট ঘটেছে। ফলে তিনি কখন কী বলছেন এবং করছেন, তা তিনি নিজেও জানেন না।

দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির ছত্রছায়ায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার পর থেকে দলটির নীতি-আদর্শ ভুলুণ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করেন দলের একাংশ। তারা ওই সময়ই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সঙ্গে রেখে জোট গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাদের মতকে উপেক্ষা করেই ড. কামাল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন, জাতীয় নির্বাচনেও জোটবদ্ধভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। পরে ঐক্যফ্রন্টবিরোধীদের একাংশও ড. কামালের সিদ্ধান্তকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আরেকটি অংশ এখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি।

দলের এই অংশের নেতাকর্মীদের মত, ড. কামালের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম এখন আর তার নীতি-আদর্শের মধ্যে নেই। দলটি এখন দেশি-বিদেশি অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থাতেও ড. কামাল যদি নীতি-আদর্শের পক্ষে ফেরত আসতে না পারেন, সেটি হবে গণফোরামের কফিনে শেষ পেড়েক ঠোকার সামিল।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে দলের নেতা শফিক উল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি গণফোরামের জন্য একটু জটিল। সবকিছু বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়—  স্যারের (ড. কামাল হোসেন) কথা, আদেশ, নির্দেশ কেউ মানছে না।

দলের আরেক নেতাও বলছেন একই কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা বলেন, স্যারের (ড. কামাল হোসেনের) উপস্থিতিতে বৈঠক হচ্ছে। সেখানে যেভাবে নেতাকর্মীরা স্যারের সামনে তর্ক-বির্তক করে থাকেন, তাদের মুখের ভাষা শুনে মনে হচ্ছে না কেউ তাকে মানছে।

তবে একটু ভিন্নমত পোষণ করছেন ড. রেজা কিবরিয়া। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, কেউ ড. কামাল হোসেনের কথা রাখছেন কি রাখছেন না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে এতটুকু বলব— গণফোরাম ও দেশের মানুষ ড. কামাল হোসেনকে মূল্যায়ন করতে পারেনি।

অন্যদিকে দলের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের দাবি, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ‘মোটামুটি সমাধান’ হয়েছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, এর মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে দলের মধ্যেকার বিরাজমান সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মোটামুটি একটা সমাধানের জায়গা তৈরি হয়েছে। আগামী শনিবার (১২ ডিসেম্বর) সকালে বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে আশা করি আমাদের মধ্যে সৃষ্ট বিভাজনের মীমাংসা হবে। আগামী কাউন্সিলের তারিখও শনিবার বৈঠকেই নির্ধারণ করা হবে।

সারাবাংলা/এএইচএইচ/টিআর





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *