রক্তপাত হয় এমন পাইলসের সমাধান ন্যাচারোপ্যাথি


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

মিসেস সেলিনা তিন দিন থেকে পায়ুপথের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। প্রায় সাত দিন হলো তার পায়খানার সাথে রক্ত যাচ্ছে। এর আগে মাঝে মাঝে রক্ত যেতো, আবার বন্ধ হয়ে যেতো। এবার টানা সাত দিন ধরে যাচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে না। তার পায়খানা কষা হয়। সপ্তাহে তিন বার বা চার বার পায়খানা হয়। হওয়ার সময় কষ্ট হয়। পায়খানা হওয়ার পরও ভালো লাগে না, মনে হয় যেন শক্ত পায়খানা পায়ুপথে আটকে আছে। ঠিকমতো বসা যায় না, পায়ুপথে ব্যথা করে। আর যখন তখন পায়ুপথ চুলকায়, বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে গেলে। কিছুদিন পায়খানা স্বাভাবিক হওয়ার ওষুধ খেয়েছেন। যেদিন ওষুধ খান সেদিন স্বাভাবিক পায়খানা হয়— ওষুধ না খেলে আবার কষা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আবার ডায়রিয়া হয়ে যায়। সারাদিনে একাধিকবার টয়লেট করতে করতে পায়খানার রাস্তা ব্যথা হয়ে যায়। সারাদিন আর কোনো স্বাভাবিক কাজ করা যায় না। এইভাবে চলছে অনেকদিন। ইদানিং মাথা ঘোরে, ক্লান্ত লাগে।

মিসেস সেলিনা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। ওনার মেয়ের নাম রুশনা। রুশনারও মায়ের মতো পায়খানা কষা হয়। তবে ওর রক্ত যায় না। রুশনার পায়ুপথের বাইরে একদলা মাংসপিণ্ড বের হয়ে এসেছে। পায়খানা করার সময় খুব ব্যথা হয় সেখানে। মনে হয় যেন ফেটে ছিড়ে যাবে। টয়লেট শেষ করে বের হওয়ার পরও অনেকক্ষণ ধরে অসহ্য ব্যথা আর জ্বালা থাকে। বসতে পারে না। মাথা ঘুরাতে থাকে। দম বন্ধ লাগে। সাথে তলপেটেও টনটনে ব্যথা হতে থাকে।

মিসেস সেলিনা আর ওনার মেয়ে রুশনা দুজনেই পাইলসের সমস্যায় ভুগছেন। তাদের ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করি এবং পুরোপুরি নিশ্চিত হই। কয়েকটি ল্যাব টেস্ট দেই। এর মধ্যে হিমোগ্লোবিন টেস্টটা জরুরি। রিপোর্টে মিসেস সেলিনার হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিকের চেয়ে কম এসেছে। পায়খানার সঙ্গে নিয়মিত রক্ত বের হয়ে যাওয়ার কারণে  হিমোগ্লোবিন কমে গেছে আর তাই মাথা ঘোরাচ্ছে, ক্লান্ত লাগছে।

পাইলস কি
পাইলস একটি কষ্টকর শারীরিক সমস্যা, মলত্যাগের সময় এই কষ্টটা তীব্র হয়ে ওঠে।  আমাদের পায়ুপথের ভেতরের রক্তনালী এবং টিস্যুতে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত চাপ পড়ে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে ফুলে যায়। দিনের পর দিন এই অতিরিক্ত চাপ পড়ার ফলে একসময় তা পাইলসের সমস্যায় পরিণত হয়।

পাইলস এর প্রকারভেদ
পাইলস দুই ধরনের হয়ে থাকে। ১. অভ্যন্তরীণ পাইলস এবং ২. বাইরের পাইলস।

অভ্যন্তরীণ পাইলস
মলদ্বার বা পায়ুপথের ভিতরের রক্তনালীর গুচ্ছ এবং টিস্যুতে প্রদাহ হয়ে অভ্যন্তরীণ পাইলস হয়। এতে পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়, তবে ব্যথা থাকে না তাই রোগী অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় সমস্যা বুঝতে পারে না। অনেক সময় পায়খানা করার সময় মাংসপিণ্ডের মতো দলা বাইরে বের হয়ে আসে— তবে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে আবার ভিতরে ঢুকে যায়। পায়খানা করার পর জ্বালাপোড়া, ব্যথা হতে পারে। মিসেস সেলিনা অভ্যন্তরীণ পাইলসে আক্রান্ত।

বাইরের পাইলস
একদলা মাংসপিণ্ড মলদ্বারের বাইরে বেরিয়ে ঝুলে থাকে, যাতে একটি, দুইটি বা একাধিক নালী থাকে। পায়খানা করার সময় কষ্টকর ব্যথা হয়। পায়খানা করার পরও ব্যথা এবং অসহ্য জ্বালাপোড়া হতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে বসা যায় না। মিসেস সেলিনার মেয়ে রুশনা বাইরের পাইলসে আক্রান্ত।

কেন হয় পাইলস
পানি কম খাওয়া , আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, অতিরিক্ত তৈলাক্ত এবং ভাজাপোড়া খাবার খাওয়া, ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড খাওয়া, রাত জাগা, মাদকদ্রব্য সেবন, কোষ্ঠবদ্ধতা, ঘনঘন  ডায়রিয়া,  IBS (Irritable Bowel Syndrome) কখনো কোষ্ঠবদ্ধতা আবার কখনো ডায়রিয়া চলতে থাকা, পায়খানা করার সময় অনেকক্ষণ শ্বাস বন্ধ করে রাখা, ভারী ওজন তোলা, প্রেগন্যান্সি ইত্যাদি কারণে পাইলস হয়ে থাকে।

মিসেস সেলিনা ২০১১ সালে পাইলসের সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসেন। তখন আমি বাংলাদেশে আকুপ্রেসার আর ফুড থেরাপি নিয়ে কাজ করি। মিসেস সেলিনা আর তার মেয়ে রুশনার পাইলস হওয়ার কারণ ছিলো তাদের ভুল খাদ্যাভ্যাস আর লাইফস্টাইল। ১২০ দিনের থেরাপিউটিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ফুড থেরাপি
ওনাদের দুজনকে দুটি ফুড থেরাপির চার্ট করে ‍দেই— প্রথমে চার সপ্তাহের জন্য। পরে আবার অবস্থার পরিবর্তন বুঝে তিন ধাপে আরও তিনবার ভিন্ন ভিন্ন ফুড থেরাপি দেই।

আকুপ্রেসার
কোষ্ঠবদ্ধতা আর পাইলসের জন্য কার্যকরী আকুপ্রেসার পয়েন্টগুলোতে প্রথমে তিন সপ্তাহ থেরাপি করে দেই। এতে তাদের পায়খানার কষা ভাব দূর হয়ে স্বাভাবিকভাবে পায়খানা হওয়া শুরু হয়। তারপর তাদেরকে আকুপ্রেসার থেরাপির উপর প্রশিক্ষণ করাই— যাতে নিজেরাই নিজেদের থেরাপি নিয়মিত করতে পারেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নিয়মিত থেরাপি চালিয়ে যান— এবং ১২০ দিন পর সফলভাবে পাইলসের সমস্যা থেকে মুক্ত হন।

রক্তপাত কমাতে
মিসেস সেলিনার রক্তপাত কমাতে সিজ বাথ এবং আইস থেরাপি করি। পাশাপাশি রক্তশূন্যতা পূরণে খাদ্য ওষুধ চার্ট করে দেই। এতে কয়েকদিনের মধ্যেই তার রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায় এবং হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

১২০ দিন অর্থাৎ চার মাসের পরিপূর্ণ একটি থেরাপিউটিক চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে মা মেয়ে দুজনেই কষ্টকর পাইলসের সমস্যা থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মিসেস সেলিনা ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসার একজন সুফলভোগী। পরবর্তীতে মিসেস সেলিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের যে কোনো শারীরিক সমস্যার সমাধানের জন্য  ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসার উপর আস্থা রেখেছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তার গাইনি সমস্যাসহ আরও অনেকগুলো শারীরিক সমস্যা ভালো হয়েছে ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসায়। বর্তমানে তিনি এই চিকিৎসা পদ্ধতির একজন ভক্ত এবং প্রচারক।

সারাবাংলা/আরএফ/আইই





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: