latest

পরিকল্পিত জীবনযাপন দেবে ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’ থেকে মুক্তি


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

ইসমাত আরা ক্লান্তি আর ফ্যাকাশে চেহারায় কষ্টকর ভঙ্গিমাতে বসে আছেন। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। উনি ডান কাঁধ আর হাতের ব্যথায় অসহনীয় কষ্ট পাচ্ছেন। ব্যথার কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য আমার কাছে এসেছেন। ইসমাত আরা চাকুরীজীবি আবার ঘরে ফিরে সংসার সামলাতে হয়। গত পাঁচ বছর থেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। হাই প্রেসারও রয়েছে। দুই বছর আগে থেকে প্রায়ই ডান কাঁধ আর হাতের জয়েন্টে মাঝে মাঝে ব্যথা হতো। কষ্টকর টনটনে ব্যথা। ব্যথা কাঁধের জয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে নীচের দিকে কনুই, কনিষ্ঠ আঙ্গুল বরাবর নেমে চিনচিনে ব্যথা হতো। কোন কাজ করার শক্তি থাকতো না তখন ডান হাতে। রাতে ব্যথার জন্য অনেক সময় ঘুমাতে পারতেন না। ডান পাশ ফিরে শুতে পারতেন না, ডান কাঁধে আর হাতে চাপ পড়লেই অসহ্য ব্যথা হত। অফিসের কাজ করতে খুব সমস্যা হচ্ছিলো, কাজের মান নেমে গেছে। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়েছেন। তাতে ব্যথা কিছুটা কমলেও আবার ফিরে আসত।

এভাবেই চলছিল। এর প্রায় তিনমাস পর থেকে দেখলেন যে, হাত উঠিয়ে চুল আঁচড়াতে গেলে, জামা পরার সময় হাত উপরে উঠালে, পিঠ চুলকাতে গেলে খুব কষ্ট হচ্ছে, ব্যথা করে ওঠে জয়েন্টে, হাত নাড়াতে কষ্ট হয়। এরকম হলে গরম সেঁক দিলে আরাম লাগত, ব্যথাও কিছুটা কমত। কিন্তু আবার ফিরে আসত। এর প্রায় মাসখানেক পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মশারি তুলে খাট থেকে নামতে যেয়ে দেখেন যে, ডান হাত আর উপরে উঠছে না, অর্ধেক উঠে আটকে গেছে। আর প্রচন্ড ব্যথা। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়েছেন।

পাশাপাশি কিছুদিন ফিজিওথেরাপি করিয়েছেন। এতে সাময়িক ব্যথা কমেছে তবে আবার শুরু হয়েছে। এখন অবস্থা হল, হাত আর উপরে ওঠাতে পারছেন না। পাশে ছড়াতে পারেন না, পিছনেও নিতে পারেন না। মেয়ের সাহায্য ছাড়া পোশাক পরতে পারেন না। নড়াচড়া করলে অসহ্য ব্যথা হয়। অফিস করেন মাঝে মাঝে। ছুটিতে থাকেন বেশিরভাগ সময়। পরিবারকে পছন্দের কোন খাবার রান্না করে খাওয়াতে পারেন না। গৃহকর্মীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন পুরোপুরি। ইসমাতের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে গেছে। এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানাচ্ছিলেন ইসমাত।

সমস্যার বিবরণ শুনে ওনার ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করি এবং নিশ্চিত হই যে, ইসমাত ফ্রোজেন শোল্ডারে ভুগছেন। সহজ ভাষায় যাকে বলে কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া। Active Range of Motion এবং Passive Range of Motion দুটো ফিজিক্যাল এক্সামিনেশনেই দেখা গেলো উনি ডান হাত পুরোপুরি উপরে উঠাতে পারছেন না, পাশে সোজা করতে পারছেন না এবং হাত সামনে থেকে পিছনে আবার পিছন থেকে সামনে ঘোরাতেও পারছেন না। ইসমাত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যার ফলে ওনার ফ্রোজেন শোল্ডারের কষ্টটা বেশি হচ্ছে আর সহজে সারছেও না। স্ট্রোক, অ্যাক্সিডেন্ট এমন অন্যান্য কারণেও ফ্রোজেন শোল্ডার হয় তবে যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের ফ্রোজেন শোল্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। কারণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। আর এই সুগার কাঁধের জয়েন্টের কোলাজেনে যেয়ে জমা হয়ে জয়েন্টকে শক্ত করে ফেলে। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ফ্রোজেন শোল্ডার ভালো করতে হলে ফ্রোজেন শোল্ডারের চিকিৎসার পাশাপাশি রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা জরুরি।

কোলাজেন হাড়কে জয়েন্টের সাথে ধরে থাকতে সাহায্য করে। রক্তের সুগার বা চিনির দানা কোলাজেনে জমা হয়ে কোলাজেনকে আঠালো শক্ত করে ফেলে ফলে জয়েন্টের স্বাভাবিক মুভমেন্ট বাঁধাগ্রস্থ হয়। এবং কাঁধ শক্ত হয়ে যায়। Collagen একধরনের প্রোটিন। রক্তের অতিরিক্ত সুগার যখন কাঁধের প্রোটিন স্ট্রাকচার কোলাজেনে এটাচড্ হয়ে যায় তখন ফ্রোজেন শোল্ডার হয়। এই প্রক্রিয়াটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Glycosylation (গ্লাইকোসাইলেশন) বলে।

ইসমাতের কষ্টটা তাৎক্ষণিকভাবে কমানো জরুরি ছিল। তাই তখনই ওনাকে আকুপ্রেসার থেরাপি করি আর তারপর ডান কাঁধে হাইড্রোথেরাপি দেই। এতে ওনার ব্যথার কষ্ট প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কমে যায়। উনি বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আর হেসে আমাকে বলেন, ‘কি যাদু দেখালেন! টিপাটিপি আর পানি ছোঁয়ায়েই যদি এতটা আরাম দিতে পারেন তাহলে পুরা সারায় দেন ব্যথা, হাতটা আগের মতো চালু করে দেন। আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো’। মানুষটার জন্য মায়া লেগে যায় খুব। ওনাকে বুঝিয়ে বলি, শুধু ওষুধ খেলে আর কিছুদিন ফিজিওথেরাপি নিলে এই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবেনা। এর থেকে রেহাই পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা। মানে একটি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফস্টাইল মেনে চলা। পাশাপাশি চার মাস ধৈর্য্য ধরে থেরাপিউটিক কোর্স চালিয়ে যাওয়া। এবং পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী অনুসরণ করা। উনি সব নিয়ম মেনে চলতে রাজি হন এবং চার মাস থেরাপির কোর্সও করতে রাজি হন। শুধু শর্ত দেন, এই কষ্টকর অবস্থা থেকে যেন মুক্তি পান। হাতটা যেন আগের মতো নড়াচড়া করতে পারেন। আল্লাহর উপর ভরসা করে ওনার চিকিৎসা শুরু করি।

★ ফুড থেরাপি
প্রথমে ত্রিশ দিনের একটি ফুড চার্ট করে দেই। যেটা ফলো করলে রক্তে সুগার স্বাভাবিক মাত্রায় থাকবে। পরে আরো তিন ধাপে ফুড চার্ট করে দেই ওনার অবস্থার পরিবর্তন সাপেক্ষে।

★ হারবাল
খাওয়ার জন্য দুটো হারবাল প্রোডাক্ট বানিয়ে দেই যেগুলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। আর সকাল-সন্ধ্যায় কাঁধে লাগানোর জন্য আরো দুটো হারবাল বানিয়ে দেই। এগুলোর প্রয়োগে দুই সপ্তাহেই উনি আরাম পাচ্ছিলেন। রাতে ঘুমের কষ্টটা কমে গিয়েছিল। আগের তুলনায় ভালো ঘুমাতে পারছিলেন।

★ হাইড্রোথেরাপি
টানা সাতদিন কোল্ড হাইড্রোথেরাপি করাই। এরপর সাতদিন হট এন্ড কোল্ড অলটারনেটিভ হাইড্রোথেরাপি চলে। চৌদ্দ দিন শেষে প্রতি সপ্তাহে একবার হাইড্রোথেরাপি করাই নিয়মিত তিনমাস।

★ ডিপ মাসাজ
প্রথম দুই সপ্তাহ প্রতিদিন পার্সিয়াল ডিপ মাসাজ করি। এর পর থেকে প্রতি সপ্তাহে একদিন ডিপ মাসাজ চলে দ্বিতীয় মাস পর্যন্ত। তৃতীয় মাস থেকে পনের দিনে একবার মাসাজ করাই।

★ আকুপাংচার
হাইড্রোথেরাপি আর মাসাজের পাশাপাশি দুই সপ্তাহ আকুপাংচারের পয়েন্টগুলোতে আকুপ্রসার করি। এতে ওনার ব্যথা কমে যায় প্রায় ষাট শতাংশ। আর হাতের নড়াচড়া স্বাভাবিক না হলেও স্বস্তি ফিরে আসে।

দুই সপ্তাহ পর থেকে তিন সেশন আকুপাংচার করি। দশদিন টানা আকুপাংচার করাই এরপর সাতদিন বন্ধ রাখি। আবার দ্বিতীয় সেশনে দশদিন আকুপাংচার করে সাতদিন বন্ধ রেখে তৃতীয় সেশনে আরও দশদিন আকুপাংচার করি।

আকুপাংচারের সেশন চলতে চলতে ব্যথা ভালো হয়ে যায়। রাতে ঘুমাতে পারেন। মাথা নিচু করে নিজে নিজে জামাও পরতে পারছেন। এখন নিয়মিত অফিসে যাচ্ছেন।

★ ইয়োগা
দ্বিতীয় মাস থেকে উপরের থেরাপির পাশাপাশি ইয়োগা করানো শুরু করি। ইয়োগা আমাকে করিয়ে দিতে হত শুরু করানোর পর থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত। এর পর থেকে উনি নিজে নিজে করার চেষ্টা শুরু করলেন আমি শুধু ইনস্ট্রাকশন দিতাম আর মাঝে মাঝে সাহায্য করতাম। এটা সম্ভব হচ্ছে কারণ এখন ওনার হাত কিছুটা উপরে এবং পাশে নাড়াতে পারছেন।

তৃতীয় মাস থেকে উনি রান্না করতে পারছেন। আমাকে খাইয়েছেন নিজে রান্না করে কয়েকবার। অফিসেও যাচ্ছেন নিয়মিত।

★ চতুর্থ মাসে সবসময় মেনে চলার জন্য ওনাকে যে জীবনযাপন প্রণালি করে দেই-
– খাদ্য তালিকা করে দেই সবসময় মেনে চলার জন্য;
– সপ্তাহে পাঁচদিন ইয়োগা করাই এবং পরবর্তীতে নিজে নিজে করতে পারবেন এভাবে ইয়োগা সেশনটা গুছিয়ে দেই। যাতে ওনার হাতের মুভমেন্ট স্বাভাবিক থাকার পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে;
– সপ্তাহে একদিন মাসাজ আর আকুপ্রেসার করাই। পরবর্তীতে প্রতি পনের দিনে একবার মাসাজ আর আকুপ্রসার নিতে হবে এক্সপার্টের কাছ ;

চার মাসের কোর্স চলাকালীন সময়ের মধ্যেই ইসমাত আরার ডান হাত সচল হয়ে যায়। উনি এখন নিজে চুল আঁচড়ান, কাপড় পড়েন। নিয়মিত অফিস করেন, রান্নাও করেন। হাত ঘুরিয়ে পিঠ চুলকাতে পারেন। ধৈর্য, লেগে থাকা আর নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যসম্মত জীবন অনুসরণ করলে কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া কঠিন ফ্রোজেন শোল্ডারও ঠিক হয়। শরীরের যত্ন নিলে শরীরও আপনার যত্ন করবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। ইসমাত আরা ভালো আছেন। ওনার ফাস্টিং ডায়াবেটিস এখন ৬ থেকে ৬.১ এর মধ্যে থাকে। কাঁধ ব্যথা, হাত ব্যথা এখন অতীত হয়ে গেছে। আমার সাথে যখন কথা হয় তখন ন্যাচারোপ্যাথির প্রচার আর প্রসারের জন্য কতো পরিকল্পনা করেন! ফ্রোজেন শোল্ডারে ভুগছেন যারা হতাশ না হয়ে পরিকল্পিত জীবন অভ্যাসে ফিরে আসুন, সুস্বাস্থ্য উপভোগ করুন।

সারাবাংলা/আরএফ





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *