‘এমপি’ বানাতে জাপার বড় পদে নেতাদের স্ত্রী, উপেক্ষিত গঠনতন্ত্র!


আজমল হক হেলাল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ভবিষ্যতে ‘এমপি’ বানাতে রাজনীতির খাতায় স্ত্রীদের নাম লিখিয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতারা। এক্ষেত্রে দলটির গঠনতন্ত্র মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, পার্টির চেয়ারম্যান তার একক ক্ষমতাবলে কাউকে উপদেষ্টা, আবার কাউকে কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান পদ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, যে কেউ রাজনীতিতে আসতে পারেন। তবে পদ-পজিশন পাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন মানা উচিত। জাপার ক্ষেত্রে এসব মানা হয়নি। এতে করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চাপা ক্ষোভ। দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এসব বিষয় নিয়ে কাউকে (তোমাকে) ওকালতি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ইউ আর নট অথরিটি। আর এসব বিষয় নিয়ে যারা কথা বলেছে তা অবান্তর।’

এর পরই তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সবাই সব কিছু যদি বুঝতেন এবং জানতেন তাহলে সবাই চেয়ারম্যান হতেন। যেহেতেু দলটিতে নারীর সংখ্যা কম। তাই নারী নেত্রী বাড়ানো হচ্ছে। দলটিতে ৫০ শতাংশ নারী দরকার। পার্টিতে রেসপেক্টেবল মহিলা প্রয়োজন। এজন্য আমি বলেছি যারা জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতে ইচ্ছুক তারা যোগ দিতে পারেন। এজন্য আমার স্ত্রীসহ অনেক নেতার স্ত্রীও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। তারা সবাই দলের জন্য কাজ করছেন।’

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জেলে থাকাবস্থায় যেসব নারী রাজপথে আন্দোলন করেছেন তারাতো দলটির পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?- জাবাবে জিএম কাদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে ত্যাগী কোনো নেতাকর্মী নেই। জাপায় ত্যাগ করার মতো কোনো স্কোপ সৃষ্টি হয়নি কখনও। এসব হয়েছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। জাতীয় পার্টি নয় বছর ক্ষমতায় ছিল। এরশাদ সাহেব জেলে থাকাবস্থায় হাতে গোনা কয়েকজন রাজপথে নেমেছে।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি করতে হলে লিডারশিপ মানতে হবে। অন্যথায় দল ছেড়ে দিতে হবে।’

এদিকে দলটির একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, যেসব মহিলাকে পদ-পজিশন দিয়ে জাপায় নেওয়া হয়েছে তারা কখনোই জাপা অফিসে কিংবা দলীয় কোনো অনুষ্ঠানে নেননি। দলটির নীতি আদর্শ এবং গঠনতন্ত্র সর্ম্পকে তাদের কোন ধারণা নেই। এছাড়া গত ১৯ বছর ধরে জাতীয় মহিলা পার্টির কোনো সম্মেলনও হয়নি। মহিলা পার্টি প্রায় বিলুপ্তির পথে। একজন প্রভাবশালী মহিলা ছয়টি পদে রয়েছেন। এছাড়া দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব সাইদুর রহমান টেপার স্ত্রী চেয়ারম্যানের উপদেষ্ট, দলটির বর্তমান মহাসচিব জিয়া উদ্দিন বাবলুর স্ত্রী ভাইস চেয়ারম্যান, দলটির কো চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার স্ত্রী ভাইস চেয়ারম্যান, দলটির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার স্ত্রী চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং কাজী ফিরোজ রশিদের মেয়ে জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলাবিষায়ক সম্পাদিকা পদে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ যখন গঠিত হয় তখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির চেয়ারম্যান। তার স্ত্রী রওশন এরশাদ ছিলেন উপনেতা। এরপর এরশাদ বেঁচে থাকতেই ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান মনোনীত করে যান। গত বছর ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন ও কাদের দুজনই চেয়ারম্যান পদের প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু দলের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা কাদেরের পক্ষে অবস্থান নিলে রওশন পিছু হটেন। গত ডিসেম্বরে দলের কাউন্সিলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জিএম কাদের। তাদের মধ্যে এখনও ক্ষমতার লড়াই অব্যহত রয়েছে।

সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গতবছর কাউন্সিলের পর থেকে দলটির মধ্যে চেইন অব কমান্ডের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সিনিয়র অধিকাংশ নেতা জিএম কাদেরের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি। কাউন্সিলের আগেই অবশ্য এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটির মধ্যে আরেকটি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছিল। সম্মেলনের পর থেকেই এরা জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকে। তাদের সেই কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।

নেতাকর্মীদের মতে, জাপা পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমান চেয়ারম্যানের যোগ্যতার অভাব রয়েছে। তিনি কখন কাকে কি বলছেন এবং কি কাজ করছেন তা নিজেও জানেন না। কখনও তিনি নেতাকর্মীদের আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, ‘বড়দলের সঙ্গে জোট নয়, রাজনীতিতে একলা চলো নীতি গ্রহণ করবে জাতীয় পার্টি।’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাবেন। কখনও তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করবে জাপা। এজন্য আট বিভাগে দলটির পক্ষে জনসমর্থন যাচাইয়ে জরিপ চলছে। মূলত জাপা আগামীতেও ক্ষমতার শরিক দল হিসেবে থাকবে।’

গত নির্বাচনে মহাজোট থেকে জাপা প্রার্থীরা ২৪টি আসনে প্রতিদন্দ্বিতা করেন। আগামীতে ১৫টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে দলটির হিমশিম খেতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তাদের জরিপে ৭০টি আসনের জন্য যোগ্য প্রার্থী পেয়েছেন। কিন্তু তাদের এই দাবি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা।

এসব বিষয় নিয়ে দলটির মহানগরের এক নেতা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার ছোট ভাই জিএম কাদের কিন্তু এক নয়। এরশাদ নেতাকর্মীদের কাছে টেনে নিতেন। আর জিএম কাদেরের আচরণে নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, দূরে সরে যাচ্ছেন। তার আচরণে অনেকেই দল ছেড়ে দিয়েছেন। যারা দলে আছেন তারাও তেমন তৎপর নয়। তিনি মূলত রাজনীতি করছেন ক্ষমতায় শরিক হওয়ার জন্য, দলকে শক্তিশালী করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়।’ এই নেতার মতে জাতীয় পার্টিকে দিয়ে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো দাবি আদায় সম্ভব নয়।

সারাবাংলা/এএইচএইচ/পিটিএম





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: