গর্ভপাত পরবর্তী রক্তপাত এবং শারীরিক জটিলতার প্রাকৃতিক সমাধান


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

বিয়ের নয় বছর পর বিভিন্ন চেষ্টার পর মিসেস মোমেনীর একটি মেয়ে হয়েছে। মেয়ের বয়স সাড়ে চার বছর। গত দুই বছর চেষ্টার পর দুইমাস আগে দ্বিতীয় বাচ্চা কনসিভ করেন। কিন্তু দুইমাস পর গর্ভপাত হয়ে যায়। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ মিসেস মোমেনী আমার কাছে এসেছেন সুস্থ জীবনের প্রত্যাশায়। তিনি জানান, প্রায় নয় বছর ধরে বাচ্চা হওয়ার সমস্যাসহ আরও নানা সমস্যার জন্য ডাক্তার দেখিয়ে নানাধরনের ওষুধ খেয়ে চলেছেন। এখন আর ওষুধ খেতে ভালো লাগে না। আমার একজন পুরোনো রোগির মাধ্যমে ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে পেরে আমার কাছে এসেছেন।

মিসেস মোমেনী জানান যে, ওনার সবসময় তলপেটে ব্যথা থাকে, ভার ভার লাগে। বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়, কাজ করতে কষ্ট হয়, হাঁপিয়ে যান। নামাজের সময় সেজদা দিতে কষ্ট হয়। বুকে চাপ লাগে, দম বন্ধ হয়ে আসে। পিঠে প্রচন্ড ব্যথা। চুল আঁচড়ালে মুঠো মুঠো চুল পড়ে যাচ্ছে। মুখে ব্রণ এবং ত্বক খসখসে হয়ে যাচ্ছে। মাসিক সবসময় অনিয়মিত। গর্ভপাত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে।

ওনার পুরনো ল্যাব রিপোর্টগুলো দেখলাম। মিসেস মোমেনীর ল্যাব রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে ওনার লিভারে ফ্যাট জমেছে এবং সেটা সেকেন্ড গ্রেড পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। জরায়ু স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে বড়। ব্রেস্টে সিস্ট রয়েছে। আমি ওনার ব্লাড লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করাই। রিপোর্টে দেখা যায় রক্তে কোলেস্টরেল অনেক বেশি। এছাড়া মিসেস মোমেনীর ওজনও অনেক বেশি। এত সব শারীরিক জটিলতা যে মানুষটির, তার বর্তমান বয়স মাত্র ২৬ বছর। বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সে। বিয়ের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

মিসেস মোমেনীর সাথে অনেক সময় নিয়ে কথা বলার পর বুঝলাম, ওনার সমস্যাগুলো শারীরিক হলেও এর সূত্রপাত হয়েছে মানসিক কষ্ট থেকে। অল্প বয়সে বিয়ে, বিয়ের পর থেকে নানান মানসিক চাপ সামলাতে হয়েছে যা দিনের পর দিন চেপে রেখেছেন। কারও সাথে শেয়ার করতে পারেননি। মিসেস মোমেনীর সাথে প্রথম সিটিং শেষে ওনাকে কাউনসেলিং সেশনের জন্য দ্বিতীয় সিটিং দেই। দ্বিতীয় সিটিংয়ে মিসেস মোমেনীকে ওনার অসুস্থতার কারণগুলো বুঝিয়ে বলি এবং আশ্বস্ত করি যে, নিশ্চয়ই উনি শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রত্যাশিত সুস্থ একটি জীবন উপভোগ করতে পারবেন। এর জন্য ওনাকে নিয়ম অনুযায়ী ধৈর্য ধরে ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসার নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। মিসেস মোমেনী আশ্বস্ত হন এবং চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হন।

তিন মাসের একটি চিকিৎসা পরিকল্পনার মাধ্যমে মিসেস মোমেনী বর্তমানে শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ সাবলীল একজন মানুষ। তিন মাসের ন্যাচারোপ্যাথি  চিকিৎসা প্রোগ্রামে যেসব থেরাপিগুলো মিসেস মোমেনীর উপর প্রয়োগের মাধ্যমে উনি সুস্থ সুন্দর জীবন উপভোগ করছেন সেগুলো হলো-

ফুড থেরাপি
প্রথম মাসে মিসেস মোমেনীর জন্য একটি সারাদিনের খাদ্য তালিকা করে দেই। এটি এমন একটি খাদ্য তালিকা যা অনুসরণ করে খাবার খেলে মিসেস মোমেনীর বয়স এবং উচ্চতা অনুযায়ী ওনার দৈনন্দিন ক্যালোরি চাহিদা পূরণ হবে এবং ওনার রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টরেল কাটতে থাকবে।

দ্বিতীয় মাসে ওনার শরীরের অতিরিক্ত মেদ এবং ওজন কমানোর জন্য সে উপযোগি খাদ্যতালিকা করে দেই।

তৃতীয় মাসে ওনার রক্ত, লিভার থেকে চর্বি এবং ওজন কমানোর উপযোগী একটি খাদ্য তালিকা করে দেই।

যেহেতু তার একবার গর্ভপাত হয়েছে তাই খুব সাবধানতার সাথে ওনার ওজন কমানোর রুটিন করতে হয়েছে। কেননা এই শারীরিক অবস্থায় ওনার পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন। দুইমাসে ওনার পাঁচ কেজি ওজন কমে।

হারবাল
একটি হারবাল প্রোডাক্ট বানিয়ে দেই যেটা সকাল বিকাল দুইবেলা চল্লিশ দিন খেলে রক্তে কোলেস্টেরল কমে। আরেকটি হারবাল দেই যেটা বাড়তি ওজন ঝরাতে সাহায্য করে।

মিসেস মোমেনীর চুলের জন্য হারবাল প্যাক দেই। আর ত্বকের সমস্যা সমাধানের জন্য হারবাল ফেস প্যাক বানিয়ে দেই।

আকুপ্রেসার
জরায়ুর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি এবং ওনার অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় আকুপ্রেসার পয়েন্টগুলোতে টানা তিন সপ্তাহ থেরাপি করাই।

ইয়োগা
যোনীপথে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য কার্যকরি ইয়োগা আসনগুলো করাই তিন সপ্তাহ। এর পাশাপাশি অস্বাভাবিক বড় জরায়ু ছোট হতে সাহায্য করে সেই আসনগুলোও করাই। তবে ওনার সব অনুশীলনই খুবই সাবধানতার সাথে আমার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে করাই যেহেতু ওনার শারীরিক অবস্থা নাজুক ছিলো।

প্রথম চল্লিশ দিন চলাকালীন অবস্থায়ই তার পেটে ব্যথা কমে যায়। তলপেটে যে ভার ভার অনুভূতি ছিলো সেটাও ভালো হয়ে যায়। দ্বিতীয় মাসে উনি জানান যে, এখন উনি নামাজে সহজেই সিজদা দিতে পারেন এবং অনেকক্ষণ সিজদায় থাকতেও পারেন। হাঁটাচলা কাজকর্ম করতে যে কষ্ট হতো এখন আর হয় না। একদিন তার পরিবারের কাছের মানুষদের দাওয়াত করে বাসায় আনেন আমার উপস্থিতিতে। সেদিন উনি আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসার মাধ্যমে পাওয়া সুফলগুলো উনি সবার সামনে বলতে থাকেন। উনি সেদিন সবাইকে বলেন যে, ‘দীর্ঘ নয় বছর ধরে আমি কতো ওষুধ খেয়েছি। আর বর্তমানে আমি কোন ওষুধ না খেয়েই শুধুমাত্র ন্যাচারোপ্যাথির থেরাপি আর নিয়মগুলো মেনেই কতো সুন্দর স্বাভাবিক সুস্থ জীবন উপভোগ করতে পারছি! শুকরিয়া আল্লাহপাকের দরবারে’।

তিনমাস চিকিৎসা শেষে তার যোনীপথ থেকে রক্তপাতও বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিক এবং নিয়মিত মাসিক চক্র শুরু হয়। ত্বক মসৃণ হয়েছে। চুল পড়া বন্ধ হয়েছে। মিসেস মোমেনীর থেরাপীর পাশাপাশি কয়েকটি কাউন্সিলিং সেশনও করাই। এতে করে ওনার মানসিক শক্তি বাড়ে এবং সমস্যা সমাধানে পারষ্পারিক আলোচনা করার দক্ষতা তৈরি হয়। উনি এখন আত্মবিশ্বাসী সুস্থ একজন মানুষ।

সারাবাংলা/আরএফ





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *