বাগযুদ্ধ পেরিয়ে কদর্য আক্রমণ, বিব্রত আ.লীগ হাইকমান্ড


নৃপেন রায়, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ ‘কথার রাজনীতি’। প্রতিপক্ষকে বাগযুদ্ধ তথা কথামালা বা শব্দমালার সৌন্দর্যে ধরাশায়ী করার প্রতিযোগিতা কোথায় নেই? জাতীয় রাজনীতির মাঠে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে কথার সেই লড়াই চলছে সমানতালেই। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি’র বাগযুদ্ধ থামেনি একদিনের জন্যও। সম্প্রতি সেই বাগযুদ্ধই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের সীমা পেরিয়ে ‘কদর্য আক্রমণে’ রূপ নিয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতিতে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যক্তি আক্রমণের এই কথার লড়াই দলের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত হাইকমান্ডকে হস্তক্ষেপ করে বাগযুদ্ধের কদর্য এই রূপকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধার নেতারা বলছেন, বড় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগে সবসময়ই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ছিল। স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় নেতাদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল ইতিবাচক। এসব ক্ষেত্রে নেতারা দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে কথার লড়াইয়ে নেমেছেন, তবে সেই লড়াই কখনো লাগামছাড়া হয়নি, পরিণত হয়নি কদর্যতায়। কিন্তু সম্প্রতি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বেশকিছু নেতা নিজেদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা স্থানীয় রাজনীতির ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে পরস্পরকে কদর্য ভাষায় আক্রমণের কৌশল বেছে নিয়েছেন। এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদের জাহির করার এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিযোগিতায় নেমে গেছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের গত একযুগের পথচলাতেও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যেও বাগযুদ্ধ বা কথার লড়াই একেবারে কম হয়নি। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তখন সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বিদায় নিয়েছেন। দলের সেকেন্ড ইন-কমান্ডের পদে তখন ওবায়দুল কাদের।

ওই সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাদের মধ্যেকার ‘বাগযুদ্ধে’র কথা উঠে আসে গণমাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সদ্যসাবেক সাধারণ সম্পাদকের কথার লড়াই থামলেও সেদিনের জের ধরে সেই লড়াই চলে আরও বেশ কিছুদিন। তবে তাদের সেই বাগযুদ্ধ কখনোই কদর্যতায় রূপ নেয়নি।

ওই সময় জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আমাদের দলের কিছু নেতা প্রকাশ্যে দলের নেতাকর্মীদের সমালোচনা করছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। দলের সমালোচনার জন্য দলীয় ফোরাম আছে, সেখানে কথা বলা যেতে পারে। প্রকাশ্য জনসভায় দলের দায়িত্বশীল নেতা হয়ে সমালোচনা মানায় না।’ সেদিন সৈয়দ আশরাফ তার বক্তব্যে কারও নাম উল্লেখ না করলেও সবাই বুঝতে পারছিলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশেই কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

এদিকে, ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে যুবলীগের আলোচনায় উপস্থিত থাকার কথা দিলেও অসুস্থতার কারণে যোগ দেননি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। একদিন পর যুবলীগের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্যের শুরুতেই ওবায়দুল কাদের কারও নাম উল্লেখ না করেও সৈয়দ আশরাফকে ইঙ্গিত করেই বলেন, সংগঠনের নেতাকর্মীদের বলেন, ‘যারা কথা দিয়েও আসেন না, তাদেরকে যেন ভবিষ্যতে দাওয়াত দেওয়া না হয়!’

এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইভী রহমান ও সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের মধ্যেও কথার রাজনীতি জমে ওঠে। সেসময় সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরোধিতায় সরব থাকা শামীম ওসমানকে গণভবনে ডাকেন শেখ হাসিনা। দু’জনকেই সতর্ক করে দিয়ে সুরাহা টানেন।

তবে এবার পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নেতা হিসেবে কথার রাজনীতির মাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা। নিজের নির্বাচনি প্রচারণায় জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক রাজনৈতিক চর্চার অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। শুধু তাই নয়, দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকেও আক্রমণ করেন কথা দিয়ে।

কাদের মির্জা সবশেষ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকে আক্রমণ করে কথা বললে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নিক্সন চৌধুরী একপর্যায়ে কাদের মির্জাকে ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেন। নিক্সন চৌধুরীকে থামাতে শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারক মহলকে আহ্বান জানান কাদের মির্জা। তিনি বলেন, ‘এ দেশে যখন যারা ক্ষমতায় আসে, কিছু কিছু লোক মনে করেন দেশটা তাদের। নিক্সন চৌধুরী সাহেব, আপনি কী করেন— এ দেশের মানুষ তা জানে, মিডিয়াকর্মীরা জানে। আমি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের বলব, আপনারা যদি নিক্সন চৌধুরীর মতো অপরাজনীতিবিদদের না থামান, গণআদালতে একদিন আপনাদের বিচার হবে।’

নিক্সন চৌধুরী ও আবদুল কাদের মির্জার ‘লাগামহীন’ বক্তব্যের মধ্যেই আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে রাজাকার পরিবারের সদস্য বলে মন্তব্য করে নতুন খোরাক জুগিয়েছেন নোয়াখালী-৪ (সদর ও সুবর্ণচর) আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী। ফেসবুক লাইভে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি কথা বললে তো আর মির্জা কাদেরের বিরুদ্ধে কথা বলব না। আমি কথা বলব ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে। একটা রাজাকার পরিবারের লোক এই পর্যায়ে এসেছে, তার ভাইকে শাসন করতে পারে না।’ দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে একরামুল করিমের এমন বক্তব্যে হতবাক দলের অনেক নেতাকর্মীই।

এর আগেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ ও ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ নিক্সন চৌধুরীর মধ্যে কথার লড়াই হয়েছে। মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য শাজাহান খানের সঙ্গেও চলেছে ‘ফরিদপুরের ফাটাকেষ্ট’খ্যাত নিক্সন চৌধুরীর কথার লড়াই।

সম্প্রতি এরকমই বাগযুদ্ধ নিয়ে আলোচনায়েএসেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসি) বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। ফুলবাড়িয়া মার্কেটে ডিএসসিসি’র উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এক মানববন্ধনে হাজির হয়ে সাঈদ খোকন ব্যাপক আক্রমণ করেন মেয়র তাপসকে। খোকন বলেন, ‘তাপস ঢাকা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলাবাজি করে চলেছেন। আমি তাকে বলব— রাঘববোয়ালের মুখে চুনোপুঁটির গল্প মানায় না।’ পরে মেয়র তাপস আবার বলেন, ‘আমি আসলে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আক্রমণ করতে চাই না। তবে এটা সত্য, উনার (সাঈদ খোকনের) রাজনৈতিক জীবনে দলীয় সংগঠনের প্রয়োজনে কোনো সময় উনাকে পাওয়া যায়নি, জাতির ক্রান্তিলগ্নেও উনাকে পাওয়া যায়নি।’

আওয়ামী লীগের নেতারাই একে অন্যের বিরুদ্ধে যেভাবে কথার লড়াই চালিয়েছেন, তার জের ধরে আওয়ামী লীগ নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকে এমনও বলেছেন— আওয়ামী লীগ নেতারা ফ্রুটিকা খেয়ে নিজেদের অপরাজনীতির কথা নিজেরাই প্রকাশ করছে!

এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলে সরাসরি মুখ খুলতে চাননি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমও এ বিষয়টি নিয়ে সারাবাংলার কাছে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা বিব্রত। দলের হাইকমান্ডও বিষয়টি কোনোভাবেই ভালো চোখে দেখছে না। কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, হাইকমান্ডকেই হয়তো হস্তক্ষেপ করতে হবে এ বিষয়ে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সারাবাংলাকে বলেন, এটি যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ ধরনের কথাবার্তারে মাধ্যমে তৃণমূলে হোক কিংবা জাতীয় পর্যায়ে হোক, তারা হয়তো প্রচার পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। তবে একটি রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা বা কর্মী হিসেবে এসব কথা কেউ বলতে পারেন বলে আমরা মনে করি না। আওয়ামী লীগে শিষ্টাচার আছে। আওয়ামী লীগে নেতাকর্মীদের একে অন্যের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ, সেই শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শ্রদ্ধাবোধই আওয়ামী লীগের পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করেছে, ঐক্যের শক্তিতে পরিণত করেছে।

বাহাউদ্দিন নাছিম আরও বলেন, আমি মনে করি আওয়ামী লীগের মতো দলের নেতারা এই শিষ্টাচার মেনে চলবেন— সেটিই স্বাভাবিক হওয়া উচিত এবং দেশের মানুষও তেমনটিই প্রত্যাশা করে থাকেন। কারণ এ দলটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়ে তোলা। সেই দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে— এতে আমরা ব্যথিত ও দুঃখিত। আমি মনে করি, এ ধরনের কথা যারা বলে, তাদের সংযত হওয়া প্রয়োজন। একটি সুশৃঙ্খল দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরই সীমারেখার বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলা উচিত নয়। এই পরিমিতবোধ, শৃঙ্খলাবোধ ও দায়িত্ববোধ সবার থাকা দরকার। এ ধরনের লাগামহীন কথাবার্তা বন্ধ হওয়া খুবই জরুরি।

সারাবাংলা/এনআর/টিআর





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *