ড. কামালকে ছাড়াই গণফোরামকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ


ঢাকা: গণফোরামের দুই অংশের একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও একবার হোঁচট খেয়েছে। দলের মধ্যে চলমান অস্থিরতা দূর করতে আগামী শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দলের বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছিল। তবে একদিন আগে সেই সভা বাতিল করতে বলেছেন দলের প্রধান ড. কামাল হোসেন। এ অবস্থায় দলের একাংশ মনে করছে, ড. কামালের নেতৃত্বে আর গণফোরামকে একত্রিত করা সম্ভব নয়।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগে থেকেই দলের একাংশের কাছে ‘বিএনপি-জামায়াত ঘেঁষা’ তকমা পেয়েছেন ড. কামাল হোসেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই তাকে বাদ দিয়েই গণফোরামকে নিয়ে নতুনভাবে এগুতে চায় মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন ‘প্রগতিশীল’ অংশটি। ড. কামাল হোসেন বাতিল করলেও তারা শনিবারই দলের বর্ধিত সভা আয়োজন করবেনই বলে জানিয়েছেন। একইসঙ্গে ওই সভা থেকেই দলটির জাতীয় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার কথাও জানিয়েছেন।

গণফোরামের একাধিক সূত্র বলছে, ড. কামাল হোসেনের অনুমতি নিয়েই শনিবারের ই বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আচমকা এক চিঠি দিয়ে ড. কামাল হোসেন জানান, শনিবার কোনো বর্ধিত সভা হবে না। বর্ধিত সভার জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভাড়া করা হল রুম বাতিল করার জন্য তিনি নির্দেশনা দেন মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে।

দলের একাধিক নেতা সারাবাংলাকে জানান, এই নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন নেতা ছুটে যান যান ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে। সেখানে দীর্ঘ সময় বৈঠক হয়। একপর্যায়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে উপস্থিত নেতাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়।

বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, ড. কামাল হোসেন বৈঠকের একপর্যায়ে বলে ওঠেন, তিনি আর রাজনীতি করবেন না। এর জবাবে আ্যাডভোকে সুব্রত চৌধুরী তাকে বলেন, ‘আপনি গত দুই বছর ধরে এ কথা বলে আসছেন। আপনি আমাদের সঙ্গে দুই নম্বরি করছেন।’ এসময় ক্ষুব্ধ হয়ে ড. কামাল বৈঠক থেকে উঠে যান।

ড. কামালের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আর কোনো আলাপ না হলেও মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীসহ তাদের অনুসারী নেতারা শনিবারের বর্ধিত সভা থেকেই দলের সম্মেলনের ঘোষণা দেবেন বলে জানিয়েছেন তারা।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকে সুব্রত চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ড. কামল হোসেন আমাদের সঙ্গে দুই নম্বরি করছেন। তিনি কোনো একটি অপশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আমরা তাকে বাদ দিয়েই (শনিবার) বর্ধিত সভা করব। ওই দিন আমরা জাতীয় সম্মেলনের জন্য একটি কমিটি এবং সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করব।

মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও সুব্রত চৌধুরীর অনুসারী আরেক নেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন রাজনীতি করার অনুপযোগী হয়ে পড়েছেন। তিনি একটি বিদেশি লবি মেইনটেইন করতেন। কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে তার সেই বিদেশি লবিটিও বিলুপ্তির পথে। দেশেও তিনি গত নির্বাচনের সময়ই জামায়াত ঘেঁষা হয়ে পড়েন।’ ড. কামাল রীতিমতো মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় বছর দুয়েক হলো দলের ভেতরে কোন্দল চলে এলেও তা নিরসনে দুই পক্ষ থেকেই ড. কামাল হোসেনকে মাঝখানে রেখে মীমাংসার চেষ্টা চলে আসছে। তবে এবারে সম্ভবত সব চেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে। মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বেই হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হয়ে যেতে পারে গণফোরাম।

এ বিষয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি সারাবাংলা। কয়েকদিন আগেই পদত্যাগ করা ড. রেজা কিবরিয়ার পক্ষের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে, ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল দলের বিশেষ কাউন্সিলের পর গণফোরামের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে বাদ দিয়ে ড. রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করার পর গণফোরাম কার্যত দু’টি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এরপর দুই অংশের মধ্যে বহিষ্কার, পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে।

এর মধ্যে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে ড. কামাল হোসেন ঘোষণা করেন, গণফোরামে গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া সব বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার অকার্যকর করা হচ্ছে। ছয় দিন পর ১৯ ডিসেম্বর বেইলি রোডে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি জানান, তার দলে কোনো সমস্যা নেই। যা বিরোধ ছিল, কেটে গেছে।

পরে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান ড. রেজা কিবরিয়া। এই পদত্যাগের মধ্য দিয়েও গণফোরামে শৃঙ্খলা ফেরেনি।

২৭ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আদর্শ ও নীতি নিয়ে প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন ও যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে গণফোরাম। তবে দলটির দায়িত্বশীল নেতারাই বলছেন, গঠনের পরপরই ৪০টি জেলায় কমিটি করেছিল দলটি। এরপর আর গত ২৭ বছরে সারাদেশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি গণফোরাম। দলের নেতাদের একাংশের নেতাদেরই অভিযোগ, ড. কামাল হোসেনের কাছ থেকে সঠিক নেতৃত্ব না পাওয়ার কারণে সারাদেশে দলটির কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।

নেতাকর্মীরা আরও বলছেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণফোরাম তার নীতি আদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গড়ে তোলে। এরপর থেকেই গণফোরাম চলছে বিএনপির প্রেসক্রিপশনে। দলটির মধ্যে এমন গুঞ্জনও রয়েছে— দল পরিচালনার পরামর্শ আসে লন্ডন থেকে। এ নিয়ে গণফোরামের মধ্যে ‘বিদ্রোহী’ নেতাদের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের একাধিকবার আলোচনা ও তর্ক হয়েছে। কিন্তু ড. কামাল হোসেনের অবস্থানের নড়চড় হয়নি বলেই বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিদ্রোহী নেতা।

The post ড. কামালকে ছাড়াই গণফোরামকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ appeared first on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *