সুস্থতায় রঙের প্রভাব


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড নানা রঙে রঙিন। আমরা মানুষ বিশ্ব প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের দেহ জুড়ে চলছে রঙের খেলা। রংধনুর সাত রঙ— বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল (বে-নী-আ-স-হ-ক-লা)। এর মধ্যে লাল, নীল, হলুদ তিনটি হলো মৌলিক রঙ। বাকিগুলো হলো মাধ্যমিক রঙ, অর্থাৎ এই তিনটি রঙেয়ের সঙ্গে মিলিয়ে অন্য সব রঙ তৈরি হয়। আমি আমার আগের লেখায়ও সূর্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছি। দেখুন সূর্যের আলো আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান। এর আলোর রঙ কী হয়? আমরা দেখি সাদা তাই না! কিন্তু এই সূর্যের সাদা আলো আসলে সাত রঙের মিশ্রণ। যা আমরা সাদা রূপে দেখতে পাই। হ্যাঁ, এটাই রঙ বিজ্ঞানে প্রমাণিত। সাদা রঙের তাপের স্পর্শে বিশ্ব প্রকৃতি আসলে উপভোগ করছে সাত রঙের খেলা।

প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। নানা রূপ, নানা রঙে বর্ণিল। একেক ঋতুতে প্রকৃতি একেক রূপে সেজে ওঠে। আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। ছয় ঋতুতে প্রকৃতি ছয় রকম রূপে সাজে। খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রঙের সাজ। এই যেমন এখন চলছে বসন্ত ঋতু। বসন্তের রঙ বাসন্তী হলো লাল, কমলা আর হলুদের মিশ্রণ। ফাল্গুন-চৈত্র এই দুই মাস জুড়েই প্রকৃতিতে চলবে লাল, কমলা আর হলুদের আধিপত্য। বসন্তের ফুল শিমূলের রঙ লাল, পলাশ কমলা, গাঁদা হলুদ, কমলা, মেরুন। আমরা বসন্তকে বরণও করি বাসন্তী সাজে। প্রতিটি সৃষ্টি একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ভারসাম্যপূর্ণ। জীববৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতাকে চলমান এবং গতিশীল রাখতে ঋতুভেদে রঙের বৈচিত্র্য আছে। এই যে রঙ নিয়ে এতো কথা বলছি, কেন জানেন? কারণ আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং অসুস্থতার সঙ্গে এই রঙের রয়েছে গভীর যোগসূত্র। ন্যাচারোপ্যাথি মেডিসিনে ক্রোমোথেরাপি (Chromo therapy) নামে একটি চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। ক্রোমো মানে রঙ, আর থেরাপি মানে উপচার। অর্থাৎ ক্রোমোথেরাপি মানে রঙ দিয়ে চিকিৎসা। ক্রোমোথেরাপি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি প্রমাণিত এবং পরীক্ষিত পদ্ধতি।

আমাদের শরীর জৈব বিদ্যুৎ প্রবাহের দ্বারা পরিচালিত। প্রতিটি যন্ত্রাংশ চলতে যেমন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তেমনি শরীর নামক মহা মেশিন চলতেও বিদ্যুৎ অপরিহার্য। তবে শরীর চলে প্রাকৃতিক বিদ্যুৎ প্রবাহের দ্বারা। আমরা অনেক সময় মাথা আঁচড়ালে চিরুনি আর চুলের ঘর্ষণে পটপট শব্দ শুনি। আবার কখনও হাতের কনুই কোথাও ধাক্কা লাগলে শক খাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। এসবই হয় শরীরে প্রবাহিত জৈব বিদ্যুতের কারণে। শরীরে রঙের ভারসাম্য এই বিদ্যুৎ প্রবাহকে উজ্জীবিত করে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের শরীরের বিভিন্ন এনজাইম নিঃসরণে রঙের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন রঙের প্রভাবে ভিন্ন ভিন্ন এনজাইম ভালোভাবে নিঃসরণ হয়। এছাড়াও শরীরের কোষ এবং ডিএনএ- এর উপর রয়েছে রঙের প্রভাব। এন্ডোক্রাইন গ্রন্থির হরমোন এবং এনজাইম নিঃসরণে রঙের প্রভাব কেমন দেখুন। টেস্টিস আর ওভারির প্রাণ হলো লাল এবং কমলা রঙ, ‍এড্রিনাল কমলা, প্যানক্রিয়াস হলুদ, থাইমাস সবুজ, থাইরয়েড-প্যারাথাইরয়েড নীল, পিটুইটারি আসমানি, পিনিয়াল বেগুনি। প্রতিটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থির সবলতা এবং সুস্থতা নির্ভর করে এর সঙ্গে সম্পর্কিত রঙের যথাযথ ভারসাম্যের উপর। আবার প্রতিটি রঙের সঙ্গে বডি সিস্টেমের যোগসূত্র দেখুন।

লাল রঙ
শরীরের রক্ত লাল রঙের ধারক। তাই এনিমিয়া হলে রোগীকে লাল রঙের খাবার খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। ক্রেমোথেরাপিতে লাল রঙের খাবারের পাশাপাশি লাল পোশাক পরা এবং লাল রঙের বিভিন্ন উপাদানের পদ্ধতিগত প্রয়োগ করে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়। নিম্ন রক্তচাপের রোগীদের লাল রঙের উপচারে রক্তচাপ স্বাভাবিক করা হয়।

কমলা রঙ
ডিপ্রেশন, হতাশা, নিষ্প্রাণ রোগীদের জীবনীশক্তি ফিরিয়ে আনতে কমলা রঙের প্রয়োগ করে কর্মক্ষম স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়। এছাড়াও কমলা রঙ যৌন সমস্যার সমাধানে বিশেষভাবে উপকারী। সেকরাল অর্গানগুলো যেমন—টেস্টিস, ওভারি, এড্রিনাল কমলা রঙের প্রতিনিধিত্ব করে।

হলুদ রঙ
ঋতুরাজ বসন্তের প্রতীক হলুদ। হলুদ অন্ত্র সম্বন্ধীয় রঙ। তাই পেটের অসুখ-বিসুখে হলুদ রঙের প্রয়োগ করা হয়। যেমন লিভারের সমস্যায় কাঁচা হলুদ, কমলা ইত্যাদি হলুদ ফল, সবজি খাওয়ানো হয়। অন্ত্রের নানান রোগে হলুদ রঙের রয়েছে নানা পদ্ধতিগত প্রয়োগ। হলুদ রঙের পদ্ধতিগত প্রয়োগে ইনসুলিন নিঃসরণের গ্রন্থি প্যানক্রিয়াসকে সবল এবং কর্মক্ষম করে তোলা হয়।

সবুজ রঙ
এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি থাইমাসের যথাযথ কার্যকারিতার জন্য সবুজ রঙের উপাদান জরুরি। এছাড়াও সবুজ রঙ হৃদপিণ্ডের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। হৃদপিণ্ডের নানা রোগে সবুজ রঙের প্রয়োগে রোগী উপকৃত হয়ে থাকেন। হাইপারটেনশনের রোগীদের সবুজ বাতির আলোয় ঘুমাতে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। সবুজ জীবনের প্রতীক। হৃদপিণ্ড হৃদয়ের ধারক। হৃদয় মানে ভালোবাসা। সবুজ রঙ মনকে শান্ত ও শীতল করে।

নীল রঙ
অনিদ্রা রোগে নীল আলোর চিকিৎসা একটি কার্যকর পদ্ধতি। ওভার অ্যাক্টিভ পারসোনালিটির মানুষের জীবন স্থিতিশীল করতে নীল রঙের কার্যকরী প্রভাব রয়েছে। এছাড়াও ক্যানসার প্রতিকার এবং ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় নীল রঙের প্রয়োগ উপকারী। নীল রঙের বিভিন্ন ব্যারি ফলে ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদান রয়েছে।

বেগুনি রঙ
বেগুনি রঙ লাল আর নীলের মিশ্রণ। লাল রঙ যেমন ফিজিক্যাল বডির উপর প্রখরভাবে কাজ করে তেমনি নীল রঙ মেন্টাল বডির উপর গভীরভাবে কাজ করে। তাই বেগুনি রঙ উদ্দীপনা আর স্নিগ্ধতা দুইয়েরই বাহক। কোলেস্টরেল কমাতে বেগুনি রঙয়ের সবজি আর ফলের রয়েছে দারুণ ভূমিকা। স্মৃতিশক্তি, রক্ত প্রবাহ ঠিক রাখে বেগুনি রঙ। আবার ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে এই রঙের পদ্ধতিগত প্রয়োগ। বেগুনি রঙ জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।

প্রতিটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি যে রঙের প্রতিনিধিত্ব করছে সেই রঙের সঙ্গে রয়েছে এন্ডোক্রাইন-সংক্রান্ত অসুখ-বিসুখের সম্পর্ক। সমস্ত সৃষ্টিজগৎ ভারসাম্যের উপর টিকে রয়েছে। যেখানেই ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় সেখানেই বিপর্যয় নেমে আসে। মানবদেহও এই নিয়মের বাইরে নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে মানবদেহের এই ভারসাম্যকে হোমিওস্টেসিস (Homeostasis) বলা হয়। রঙের ভারসাম্যহীনতায় শরীর রোগাক্রান্ত হলে ক্রোমোথেরাপি প্রয়োগে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া সুস্থতা নিশ্চিত হয়। ন্যাচারোপ্যাথি চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি মৌলিক এবং কার্যকর থেরাপি পদ্ধতি এই ক্রোমোথেরাপি বা রঙ চিকিৎসা।

সারাবাংলা/আরএফ/আইই





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *