তৃণমূলে সংকট: আ.লীগের ‘প্রতিপক্ষ’ আ.লীগই


নৃপেন রায়, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, তৃণমূলে এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগই। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা দলটির মহানগর, জেলা থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড  পর্যন্ত সব জায়গায় গড়ে উঠেছে ক্ষমতার বলয়বৃত্ত। তৃণমূলে কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী ক্ষমতাকেন্দ্রিক বলয় গড়ে উঠেছে। তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা, এমপি বা মন্ত্রী, কোথাও বিশেষ প্রভাব বলয়ের ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্বে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই সংকট দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৃণমূলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা করার উদ্যোগ।

অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূলে অনেক মন্ত্রী ও এমপি কর্মীদের উপেক্ষা ও সুযোগসন্ধানী চাটুকার, আত্মীয়-স্বজনদের পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। এতে তৃণমূলে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বহুমুখী সংকট দেখা দিচ্ছে, যা আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। নিজ দলের নেতাকর্মীরাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে।

দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, টানা মেয়াদে দল ক্ষমতায় কারণে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে জন্য নিজেদের নিয়েই ‘খেলা’য় মেতে আছেন স্থানীয় নেতারা। নিজেদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রক গ্রুপ। নিজেদের মধ্যেকার এমন অন্তর্দ্বন্দ্বে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন দলের ত্যাগী-পরীক্ষিত নেতকর্মীরা। কারণ সবাই একই দল করলেও সেখানে পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে অনেক এলাকায় তৈরি হয়েছে বলয়-উপবলয়, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। কেন্দ্র থেকে অনেক জায়গায় অনেক কিছু চাইলেও সেখানে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানামুখী জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের।

তৃণমূলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীরা বলছেন, দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে তারা সব ধরনের বলয় বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলতে বদ্ধপরিকর। কারণ প্রভাবশালী এমন বলয়ে যুক্ত অনেকেই কেবল সুবিধাভোগী, অনেকে সুযোগসন্ধানী, কেউ কেউ অনুপ্রবেশকারী। তাদের এড়িয়ে তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করছেন তারা।

এর আগে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে গণভবনে সীমিত পরিসরে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে তৃণমূলের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘মাইম্যান’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’দের ঠাঁই না দেওয়ার নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি তৃণমূলে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের দুর্দিন-দুঃসময়ের ত্যাগী-পরীক্ষিত নেতাদের ঠাঁই দেওয়ার নির্দেশনা দেন। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সেই কাজ খুব বেশি এগোয়নি। সম্প্রতি কয়েক ধাপের পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের বাইরে প্রার্থিতা ঘোষণা করে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীতে পরিণত হওয়া নেতাদের নিয়ে নানা টানাপোড়েন দেখা গেছে। এ বিষয়গুলোই তৃণমূলের রাজনীতি নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে ভাবিয়ে তুলছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই নোয়াখালী বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা আলোচনায় আসেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ও পরে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ফরিদপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকে আক্রমণ করে কথা বলেন তিনি। নিক্সন চৌধুরী একপর্যায়ে কাদের মির্জাকে ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেন। এর মধ্যে আবার ওবায়দুল কাদেরকে রাজাকার পরিবারের সদস্য বলে মন্তব্য করে এই আলোচনায় নতুন খোরাক জোগান নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী।

এদিকে, ঢাকার সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগে’র রাজনৈতিক অঙ্গন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম হয়ে কর্মীসমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যদিও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগে ‘সমালোচনার সংস্কৃতি’ আছে। এটাই আওয়ামী লীগের সৌন্দর্য।

এছাড়া তৃণমূলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে বিভিন্ন স্থানে। কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. উসমান শিকদারকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে আধিপত্য বিস্তরের জন্য প্রতিপক্ষ কেউ এ ঘটনা ঘটাতে পারেন।

সম্প্রতি পৌরসভা নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে আবারও প্রকাশ্যে মাথাচাঁড়া দিতে শুরু করছে স্থানীয় কোন্দল। অধিকাংশ জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের ‘শত্রু’ এখন আওয়ামী লীগই। গত ২২ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লতিফ বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক ডা. হাবিবে মিল্লাতকে তাদের পদ থেকে অব্যাহত দেওয়া হয়। কে এম হোসেন আলী হাসান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আবদুস সামাদ তালুকদার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হোসেন আলী হাসান দল ও জেলার সরকারি দফতরগুলোতে নিজের আধিপত্য বিস্তারে তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে দলের প্রয়াত এক নেতা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওহাব আইনুদ্দিনের মিলাদ মাহফিলে অংশ নিতে গিয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনুর সরকারি গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালান স্থানীয় সাংসদ নূর মোহাম্মদের অনুসারীরা। এ ঘটনায় আদালতে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে।

অন্যদিকে, গত ২৫ জানুয়ারি রাজশাহীর দুর্গাপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হয় রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) অধ্যাপক ডা. মনসুর রহমানকে।

দলের ভেতরকার এমন অন্তর্কোন্দল নিয়ে প্রকাশ্যেই সরব হয়েছেন অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বৈঠক, আলোচনা সভাতেই তারা এসব বিরোধ মিটিয়ে দলের প্রতি অনুগত হতে সবাইকে আহ্বান করেছেন। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা মেনে না চললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন তারা।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলছেন, তৃণমূলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে তাদের নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক নেতা ও এমপি তাদের এলাকায় সম্মেলন করতে আগ্রহী নন, সম্মেলন করতে তাদের চাপ প্রয়োগ করতে হয়। কারণ সম্মেলন হলেই নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে, তাতে তাদেরও পদ হারানোর আশঙ্কা থেকে যায়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, আমাদের দল টানা কয়েক বছর ধরে ক্ষমতায়। এতে আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা-লড়াই বেড়েছে, এটা আমরা অস্বীকার করছি না। এই প্রতিযোগিতা কোথাও কোথাও হয়ত দ্বন্দ্বে রুপ নিচ্ছে। তবে দলের ঐক্যের স্বার্থে আমাদের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ, জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ। আমাদের নেত্রী সম্মেলনের ব্যাপারে সিরিয়াস। অনেক জায়গায় এমপিরা চেয়েছে সম্মেলন না হোক, কিন্তু তখন নেত্রী বলে দিয়েছেন— সম্মেলন করতে হবে। তৃণমূল গোছানোর ক্ষেত্রে নেত্রী খুব সিরিয়াস।

তৃণমূলের সম্মেলন করার ব্যাপারে স্থানীয় নেতা-এমপিরা কেন অসহযোগিতা করছেন— জানতে চাইলে এস এম কামাল বলেন, রাজি না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। অনেক এমপি আছেন, যারা জেলা-উপজেলার নেতা। তাদের অনেকে পদ ছাড়তে চান না। সম্মেলন হলে হয়তো তারা আর পদে না-ও আসতে পারেন। কারণ এর মধ্যে তৃণমূলে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অনেকেই তৈরি হয়েছেন। আবার অনেক এমপি আছেন, যারা পছন্দের লোকজনকে তৃণমূলে নেতা বানাতে চান নিজের প্রভাব ধরে রাখতে। সম্মেলন হলে তার সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নও হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে সম্মেলন নিয়ে তাদের অনীহা রয়েছে।

তবে এসব সমস্যা দূর করে তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর এস এম কামাল। তিনি বলেন, আমরা আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল গোছানোর বিষয়ে সিরিয়াস। এ বিষয়ে তার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সেগুলোই বাস্তবায়ন করব।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক সারাবাংলাকে বলেন, এই যে এখন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে, আওয়ামী লীগ হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য এটি সুখকর না। এই দলটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ ১২ বছর ক্ষমতায় অতিক্রম করছে। এই সময় সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। সেটা রাষ্ট্রের জন্য হোক, কিংবা সমাজের জন্য হোক, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে হোক— এই ধারাটি বেশ উদ্বেগজনক। এক্ষত্রে দলকে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত, সরকারেরও সতর্ক হওয়া উচিত।

জাহাঙ্গীর কবির নানক আরও বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে যারাই যে স্তরেই ঢুকে পড়ছে, তারা কারও না কারও হাত ধরেই ঢুকছে। এসব লোকজনকে যারা আমাদের দলে ঢুকাচ্ছে, তারা আসলে কারা? তারা কিন্তু পার্টির জন্য একটা বিরাট ক্ষতিকর কাজ করছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারাবাংলা/এনআর/টিআর





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *