নারীর মুড সুইং: অবহেলা নয়, সচেতন হোন


আজমেরী রহমান সিনথিয়া

কথায় আছে-যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। কথা তো ঠিক। কিন্তু অনেকসময়ই দেখা যায় নারীরা নিজের যত্ন নুতে ভুলে যান। কিন্তু আমাদের মেয়েদের একটু আলাদা যত্ন নিতে হবে। কারণ আমাদের কাঁধে হাজারো দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিষয় ভুলে যাই। তাই আমি আজ মনের কিছু রোগ নিয়ে বিস্তারিতো আলোচনা করবো। পুষ্টিবিদ মানেই তো আর শুধু খাবার নিয়ে কথা বলবে তা তো নয়। তাছাড়া পুষ্টির সঙ্গেও মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে। শরীর ঠিক থাকলে বাকিসবও ঠিক আছে। আজকের এই লেখা নারী দিবসের জন্য উৎসর্গ করা হলো।

মুড সুইং বা হঠাৎ মেজাজে পরিবর্তন কী-
ধরুন আপনি অনেক খুশি বা আনন্দিত। মুহুর্তের মধ্যে হঠাৎ ক্রুদ্ধ বা হতাশ হয়ে পড়লেন। এই অবস্থাকে মুড সুইং বলে। আবেগের এই আকস্মিক এবং নাটকীয় পরিবর্তনগুলি মনে হতে পারে যেন তারা অকারণে চলে এসেছে। আবার আমরা অনেকসময় বুঝেই উঠতে পারিনা কেন এমনটা হলো।কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে মুড সুইংয়ের।

Premenstrual dysphoric disorder বা মাসিক হওয়ার পূর্বে
প্রাক-মাসিক সিন্ড্রোম (পিএমএস) সাধারণত পিরিয়ডের ১ থেকে ২ সপ্তাহ আগের সময়কে বলা হয়ে থাকে। এসময় মেজাজ খিটখিট ছাড়াও, পিএমএস ক্লান্তি, ক্ষুধা পরিবর্তন, হতাশা, ব্যথা এবং আরও অনেক লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে। প্রায় ৯৫ শতাংশ নারীই তাদের পিরিয়ডের আগে এসকল পিএমএস-জাতীয় লক্ষণ অনুভব করেন। অনেকের ধারণা শুধুমাত্র পিরিয়ডেই এসকল বিষয় হয়ে থাকে। আপনার এ ধারনাটি ভুল। এই লক্ষণগুলির তীব্রতা এক মাস থেকে মাসে মাসে পরিবর্তিত হতে পারে। বয়স বাড়ার সাথে খারাপ হতে পারে বা উন্নতি হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা ইস্ট্রোজেন হরমোন বেড়ে যাওয়ার কারণে এই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। পিরিয়ড হওয়ার ২/১ দিনের মধ্যে ঠিকও হয়ে যায়। তাই আপনার আশেপাশের কোনো মেয়ের হঠাত পরিবরর্তন দেখলে ভড়কাবেন না। বরং তার পাশে দাঁড়াবেন।

গর্ভাবস্থা
গর্ভাবস্থায় হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আবেগ এবং মেজাজের পরিবর্তন হতে পারে। অধিকন্তু, গর্ভবতী নারীরা প্রায়শই শারীরিক পরিবর্তন এবং মানসিক চাপ অনুভব করে যা মুড সুইংয়ের কারণ। তাই গর্ভবতী মায়েদের মনে আঘাত দেওয়া যাবেনা। এক্ষেত্রে পুরো পরিবারকে একটি টিম হয়ে কাজ করতে হবে।

Premenstrual dysphoric disorder (PMDD) (পিএমডিডি)
মাসিক ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (পিএমডিডি) আরও মারাত্মক এবং বিরল প্রকারের পিএমএস। পিএমডিডি শিশু প্রসবের পরবর্তী সময়ে হয়ে থাকে। পিএমডিডি-এর লক্ষণগুলির মধ্যে মেজাজের চরম পরিবর্তন, তীব্র হতাশা, চরম বিরক্তি এবং আরও অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অনেক মা নিজেকে দোষ দেয়, কিন্তু এখানে মায়ের কোনো দোষ নেই। শরীরের একটি হরমোনের ভারসাম্য আমাদের মেয়েদের মুড সুইংয়ের বারোটা বাজিয়ে দেয়। তাই সাবধান। নিজেকে দোষ দিয়ে আরও তেরোটা বাজাবেন না।

হাইপোথাইরয়েড
হাইপোথাইরয়েডিজম, এমন একটি পরিস্থিতিতে যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত পরিমান হরমোন তৈরি করে না, এটি হরমোনের একটি সাধারণ ব্যাধি যা বদমেজাজকে প্রভাবিত করে থাকে। দেখবেন অনেকেই জানে না তার থাইরয়েড রয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত মুড সুইং হচ্ছে। তাই দেরি না করে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হবেন।

বয়: সন্ধিকাল
বয়ঃসন্ধি একটি শিশুর জীবনে মানসিক, শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের সময়। জীবনের এই পর্যায়ে মেজাজ পরিবর্তন হওয়া খুব স্বাভাবিক।

মেনোপজ
জীবনের আরও একটি বড় পরিবর্তন মেনোপজ, মুড সুইংয়ের ভান্ডার বলা হয় একে। ৩৫ থেকে ৪০ বছরের নারীদের বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু দুখঃজনক হলেও সত্যি আমাদের দেশে এ বিষয় নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। আমাদের মা-খালারা উপসর্গ হিসেবে শরীরে গরম ঝলকানি, অনিদ্রা এবং যৌনতায় অনীহাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে থাকে যা আমাদের মা-খালাদের জীবনকে রঙহীন বানিয়ে ফেলে। তাই এসময় আমাদেরকেই তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। তাদেরকে সময় বেশি দিতে হবে।

এবার আমার কাজ হচ্ছে কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আলোচনা করা। চলুন তো জেনে নেই এই মুডি ভাব কীভাবে দমানো যায়-

ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডি এখন সুপার ভাইটামিন নামে পরিচিত। সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ৩ টার মধ্যে ভিটামিন ডি পাবেন। অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে হতাশাগ্রস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে ভিটামিন ডি এর মাত্রাও কম ছিল। হতাশা হরমোনের একটি খেলা। আর এই হতাশাটাই মুড সুইং করে দেয়। তাই ডি খুব দরকারী জিনিস। যদি রোদে না যেতে পারেন তাহলে ডিমের কুসুম, দুধ, সজনে পাতা, মাশরুম ইত্যাদি খাবার খান।

ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার
জার্মান পুষ্টিবিদ পরামর্শ দিয়েছেন যে ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবার মুড সুইং মোকাবেলায় দারুণ সহায়তা করে। গাজর, টমেটো এবং মিষ্টি আলু ইত্যাদি ক্যারোটিনের ভাল উত্স। এছাড়াও ফল বা সবজির রঙ যত তীব্র হবে, তাতে তত ক্যারোটিন থাকবে।

দুধ-কলার মিশ্রণ
এ খাবারটি কিন্তু আপনার মুড সুইংকে ঘুরিয়ে ফেলতে বেশ কার্যকরী। তবে যদি গ্যাস হয় আর খুব ঘন দুধ হয়ে থাকে তাহলে হাফ গ্লাস দুধ আর হাফ গ্লাস পানি মিশিয়ে খেতে পারেন, ভারী খাবার গ্রহণের ৩০ মিনিট পরে। আর যদি ল্যাকটোজেন হজমে সমস্যা না হয় তাহলে দুধ কলা মিশিয়ে মিল্ক শেক খেতে পারেন। তাতে মুড ভালো হবে।

এছাড়াও বাদাম, সবুজ শাকসবজি, ফলমূল আর অবশ্যই প্রচুর তরলজাতীয় খাদ্য গ্রহন করবেন। আমরা মেয়েরা অনেক শক্তিশালী। কোনোভাবেই দূর্বল হলে চলবেনা। কারণ নারীরা সব পারে। তাই আজ থেকে মুড সুইংকে টাটা বাই বাই দিতে হবে। আজ তবে এ পর্যন্তই। সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন। শুভ কামনা। সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

সারাবাংলা/আরএফ





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *