গরমে আর করোনায় জল চিকিৎসা


ডা. ঐন্দ্রিলা আক্তার

ন্যাচারোপ্যাথি মেডিসিনের একটি বহুল ব্যবহৃত থেরাপি পদ্ধতি হলো হাইড্রোথেরাপি। গ্রিক শব্দ হাইড্রো মানে পানি আর থেরাপি মানে উপচার। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে হাইড্রোথেরাপিকে ওয়াটার থেরাপি বা ওয়াটার কিউর ও বলা হয়ে থাকে। প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন গ্রিস, রোম, মিশর, আমেরিকা, চিন, জাপান, ভারতসহ নানা দেশে হাইড্রোথেরাপি রোগব্যাধি উপশমের উপায় হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে । বর্তমান বিশ্বে হাইড্রোথেরাপি একটি পরীক্ষিত এবং প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাইড্রোথেরাপির চমকপ্রদ অনুশীলন হলো ওয়াটার বার্থ মানে পানিতে বাচ্চা জন্ম দেওয়া। উন্নত বিশ্বের গাইনি চিকিৎসকগণ এই পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্মদানে উৎসাহিত করেন। এতে হালকা গরম পানির মধ্যে প্রসূতি মাকে শুইয়ে বাচ্চার নরমাল ডেলিভারি করানো হয়। এই পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্মদানে লেবার পেইন তুলনামূলক কম হয়। জন্মের সময় পেরিনিয়াল জোনে আঘাত থেকে সৃষ্ট জটিলতা তৈরির ঝুঁকি কম থাকে। প্রসবের সময় উষ্ণ পানিতে শুয়ে থাকার ফলে শরীরে ব্যথা প্রশমনকারী হরমোন এনডরফিন নিঃসরণ বাড়ে। এর প্রভাবে স্ট্রেস হরমোনগুলোর নিঃসরণ কমে যায় ফলে ব্যথার অনুভূতি কম হয়। এই পদ্ধতি প্রসবের সময় পেশীর টান কমাতে সাহায্য করে এবং প্রসবের সময় জরায়ু এবং সার্ভিক্স এর সংকোচনের মাঝখানে প্রসূতি মাকে শিথিল হতে সাহায্য করে। এছাড়াও হাইড্রোথেরাপির বিভিন্ন বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহার রয়েছে।

গরমে হাইড্রোথেরাপি
আমাদের শরীরের প্রায় সত্তর ভাগ পানি। পানি ছাড়া শরীরের কোনো কার্যক্রমই সঠিকভাবে চলতে পারে না। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে তাই আমাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করতে হয়। এখন আবহাওয়া গরম হওয়ায় শরীরে পানির চাহিদা বেড়েছে। প্রস্রাব পায়খানা ছাড়াও গরমে শরীর থেকে ঘাম এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে জলীয় অংশ বের হয়ে যায়। ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পানিশূন্যতা থেকে হিট স্ট্রোক, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি-অবসাদ, চোখে ঝাপসা দেখা, কাজে মনঃসংযোগ করতে না পারা এমনকি তাৎক্ষণিক কিডনি বিকল পর্যন্ত হতে পারে। পানি পানে যারা উদাসীন তারা সতর্ক হন। গরমে সচেতনভাবে শরীরকে হাইড্রেট রাখতে হবে। শরীরকে হাইড্রেট রাখার সঙ্গে সঙ্গে বিষমুক্ত করতে চাইলে হাইড্রোথেরাপির কিছু সহজ উপায় অনুসরণ করুন।

•লেবু পানি পান
সকালে ঘুম থেকে উঠে একগ্লাস হালকা গরম লেবু পানি পান করুন। যাদের ওজন বেশি তারা এর সঙ্গে মধু মিশিয়ে পান করতে পারেন। এতে দ্রুত চর্বি কাটে। যারা লেবু পানি পান করতে পারেন না তারা ভিনেগার মিশিয়ে পান করুন। সকালে একগ্লাস লেবু বা ভিনেগার পানি যেমন সারা রাতের তৃষ্ণার পর শরীরকে হাইড্রেট করে তেমনি শরীরের মেটাবলিক বর্জ্য প্রস্রাব পায়খানার সাথে বের হয়ে যেতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি কোষ্ঠ সাফ করতে খুবই উপকারী। লেবু পানি সকাল ছাড়াও দিনে আরও কয়েকবার পান করলে রক্ত প্রবাহ পরিষ্কার থাকতে সাহায্য করে এবং সারাদিনের ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ হয়। তাই গরমের সময় তৃষ্ণা মেটাতে এবং শরীর পরিষ্কার রাখতে সকাল, দুপুর এবং বিকেলে এক গ্লাস করে লেবু পানি পান করা ভালো।

• ফ্রুট জুস
গরমের সময় শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার ফলে শরীর থেকে খনিজ লবনসমূহ বের হয়ে যেয়ে ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। খনিজ লবণের প্রধান উৎস হলো শাকসবজি, ফলমূল। ডাবের পানিতে প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। এসময় তাই সপ্তাহে দুই তিনটি ডাব খেলে ভালো। ডাবের পানি হাইপ্রেশারের রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়াও আনারস, মালটা, তরমুজ, বাঙ্গি বিভিন্ন রসালো ফল শরীরে ভিটামিন এবং মিনারেলস এর চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি শরীর থেকে ফ্যাট ঝরাতে সাহায্য করে। শরীরে জমে থাকা টক্সিন তরলীকরণ করে বের হতে সাহায্য করে। কোষ্ঠবদ্ধতা এবং পাইলসের রোগীদের কোষ্ঠ সাফ হতে সাহায্য করে।

•ভেজিটেবল জুস
গাজর, বিট, টমেটো, মূলা আর পুদিনা পাতা একসাথে মিলানো জুস গরমে লিভারের জন্য এক মহৌষধ। পুদিনা পাতার ঘোল হাইপারটেনশনের রোগীদের জন্য হাইড্রোথেরাপির এক প্রাকৃতিক সমাধান। কমলার রস জন্ডিসের জন্য উপকারী। কলমি শাকের রসে রয়েছে সিস্ট আর টিউমার ধ্বংসী রাসায়নিক উপাদান। এই গরমে এসব শাকসবজির রস যেমন তৃষ্ণা মেটায় তেমনি রোগ সারাতেও কার্যকরী।

হাইড্রোথেরাপিতে এরকম নানা ধরনের পানীয়ের ব্যবহার রয়েছে যা সহজলভ্য এবং আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য উপাদানের মধ্যেই আমরা পেয়ে থাকি। হাইড্রোথেরাপি সংক্রান্ত তথ্য জ্ঞান এবং সচেতনতা আমাদের সহজে রোগ মুক্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে।

করোনা প্রতিরোধে হাইড্রোথেরাপি
করোনা ইতিহাসের এক মহা দুর্যোগ। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং শরীরকে ফিট রাখা ছাড়া আমাদের কাছে করোনাকে প্রতিরোধ করার আর কোনো সফল উপায় এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। করোনা প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী হাইড্রোথেরাপির বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

•বার বার তরল পান করা
করোনা আক্রান্ত হন বা না হন কিছুক্ষণ পর পর অল্প অল্প করে পানি বা তরল পান করুন। এতে গলা ভিজা থাকবে ফলে করোনা ভাইরাস গলা থেকে পানির সাথে পেটে চলে যাবে। পেটের শক্তিশালী হাইড্রোক্লোরিক এসিড ভাইরাসকে ধ্বংস করে দেবে।

•নাসাল ইরিগেশন
নাসাল ইরিগেশন হাইড্রোথেরাপির একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। এতে বিশেষ উপায়ে এক নাক দিয়ে পানি ঢুকিয়ে অন্য নাক দিয়ে বের করা হয় অথবা দুই নাক দিয়ে একসাথে পানি ঢুকিয়ে একসাথে বের করা হয়। এর ফলে নাসাল প্যাসাজে লুকিয়ে থাকা জীবাণু এবং ময়লা আবর্জনা বের হয়ে যায়। সর্দি, হাঁচি কাশিতে এই পদ্ধতি খুবই আরাম দেয়। করোনাভাইরাসের জীবাণু নাক এবং গলার মাধ্যমে শরীরে ঢোকে। তাই নাসাল প্যাসাজকে পরিষ্কার রাখতে প্রতিদিন একবার নাসাল ইরিগেশন করা ভালো।

•বার বার হাত ধোয়া
খাবার খাওয়ার আগে অবশ্যই ত্রিশ সেকেন্ড ধরে ভালো করে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। এছাড়াও দিনে কয়েক বার হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। করোনা প্রতিরোধে সাবান পানি দিয়ে বারবার হাত ধোয়া প্রথম সারির প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

•হারবাল পানীয়
বিভিন্ন ভেষজ উপাদান সমৃদ্ধ পানীয় পান করলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। আদায় রয়েছে জিনজেরোল নামক শক্তিশালী এন্টিভাইরাল উপাদান। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আদা চা খেতে হবে নিয়ম করে। তুলসী পাতা এবং এর বীজে রয়েছে রোজমারিনিক এসিড নামক শক্তিশালী এন্টিভাইরাল উপাদান। এছাড়াও তুলসী ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এছাড়াও লবঙ্গ, ত্রিফলা, কালিজিরা, কাঁচা হলুদ এমন নানান ভেষজ উপাদানের তরল পান করলে শরীর জীবাণুমুক্ত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়।

•স্টিম বাথ এবং হট ওয়াটার বাথ
করোনার এই দুর্যোগে মানুষ দিনের পর দিন লকডাউনে ঘরবন্দী হয়ে মানসিক অবসাদ, হতাশা, বিষণ্ণতায় ভুগছে। অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে অসুস্থ করে ফেলছে। মানসিক অবসাদ, হতাশা, বিষণ্ণতা কাটাতে হাইড্রোথেোপির একটি খুবই কার্যকরী থেরাপি হলো স্টিম অথবা হট ওয়াটার বাথ। টাব ভর্তি উষ্ণ পানিতে গলা থেকে পা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট সময় কাটালে শরীর এবং মন ঝরঝরে হয়ে ওঠে। পানিতে এরোমেটিক হারবাল মিশিয়ে নিলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। থেরাপির রুম হতে হবে মৃদু আলোর, কোলাহল মুক্ত শান্ত। স্টিম বাথের জন্য বিশেষভাবে তৈরি স্টিম চেম্বার বসে বাথ নিতে হয়।

•হট ফুট বাথ
করোনা দুর্যোগে মানসিক দুশ্চিন্তায় যাদের রাতের ঘুম নষ্ট হয়ে গেছে তাদের জন্য হট ফুট বাথ উপকারী হাইড্রোথেরাপি। রাতে ঘুমানোর আগে এক বালতি উষ্ণ গরম পানি যা হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখবে তাতে একমুঠো এপসম সল্ট মিশিয়ে পনের মিনিট দুই পা ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন। এই সময় পছন্দের মিউজিক চালিয়ে শুনতে থাকুন। পনের মিনিট পর পা দুটো স্বাভাবিক পানিতে ধুয়ে মুছে শুয়ে পড়ুন। রাতে আরামের ঘুম হবে।

•গার্গল
ঠাণ্ডা কাশি দেখা দিক বা না দিক প্রতিদিন সকাল-বিকাল নিয়ম করে লবণ হলুদ পানিতে গার্গল করার অভ্যাস করুন। এতে গলার জীবাণু নাশ হবে, আপনার স্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে হাইড্রোথেরাপির আরও ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিভিন্ন তাপমাত্রায় সঠিক নিয়মে পানি ব্যবহার করলে তার মাধ্যমে আর্থ্রাইটিস, পাইলস, কোষ্ঠবদ্ধতা, কোমর ব্যথা, ত্বকের সমস্যা, জরায়ুর সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন এবং মেদসহ দেহের বহু সমস্যা দূর করা যায়। সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় আজ সংক্ষেপে হাইড্রোথেরাপির এমন কিছু দিক তুলে ধরলাম যা করোনার এই দুর্যোগে আপনারা ঘরে বসে অনুশীলন করতে পারবেন।

সারাবাংলা/আরএফ/আইই





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: