আবার দার্জিলিং-পর্ব ৩


জাকির হোসেন

বাংলাদেশে বাস করে হরতাল কিংবা ধর্মঘট শব্দটার প্রকৃত মানে আমরা ভুলতে বসেছি। হরতাল মানেই আমাদের দেশে জ্বালাও পোড়াও। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম সেসবের বালাই নেই। বন্দ্‌ মানে বন্দ্‌। স্বতঃস্ফুর্তভাবে সমস্ত গাড়ি ঘোড়া দোকান পাট নিজেরাই বন্ধ করে রেখেছে। কেউ যদি দোকান খোলা রাখতে চায়, বাধা দেবেনা। কেউ যদি গাড়ি চালাতেই চায় তাকেও বাধা দেবেনা। কিন্তু পরের দিন তার দিকে সবাই এমন দৃষ্টিতে তাকাবে যে লজ্জায় সে বেচারা  মরে যেতে চাইবে। আর এটা ছিল অনেক দিন ধরে চলতে থাকা দার্জিলিং এর স্বতন্ত্র রাজ্য গঠনের ডাক, গোর্খাল্যান্ড জনমুক্তি মোর্চার বন্দ্‌। দার্জিলিং এর স্থানীয়রা এই ডাক বেশ মান্য করে। কিন্তু এই বন্দ্‌ এর কারণে তো আমরা পড়লাম মহাবিপদে। জলপাইগুড়িতেই কি রাত কাটাতে হবে তাহলে? এখানে তো তেমন কাউকে চিনিও না।

দার্জিলিংয়ে আমাদের হোটেল বেলেভিউ এর ম্যানেজার তাশি পুলগারকে ফোন দিলাম। ভাগ্য ভাল সিম কার্ডটা কলকাতাতেই জোগাড় করেছিলাম। ফোনে বললাম, তোমাকে তো গতকালই জানালাম যে আমরা আসছি, তুমি আমাকে জানাওনি কেন যে এখানে আজকে বন্দ্‌? সে আমাকে কাঁচুমাচু গলায় বলে, বন্দ্‌ এর ডাক হঠাৎ করে কাল সন্ধ্যায় দিয়েছে, আমাকে সেটা সে জানাতে পারেনি। তবে চিন্তার কিছু নেই। বন্দ্‌ চলবে দুপুর একটা পর্যন্ত, আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই বন্দ্‌ শেষ হয়ে যাবে। ঘড়িতে দেখলাম বেলা বাজে সাড়ে নয়টা। দার্জিলিং যদি এখনই রওনা দেই তাহলে সাড়ে তিন ঘন্টা, মানে একটার সময় গিয়ে পৌঁছাব। অসুবিধা হবার কথা না। কিন্তু ড্রাইভারদের সেটা বোঝায় কে? আমাদের মত আরো অনেককেই দেখলাম আটকা পড়েছে। কলকাতা থেকে আসা লোকজনই বেশি। তাদেরকে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সিকিম এর গাড়িগুলো। ভারতীয়দের সিকিম যেতে কোন সমস্যা নেই। এখন অবশ্য বাংলাদেশিদেরও সমস্যা নেই। কিন্তু যে সময়ের গল্প তখনও সিকিম বাংলাদেশিদের জন্য ওপেন ছিল না। আমার কানের কাছে এসে এক দালাল ফিসিফিসি করে বলল, কেন ঝামেলা করে দার্জিলিং যাচ্ছেন বলুন তো? তার চেয়ে চলুন গ্যাংটক। দেখবেন কেমন ফার্স্ট ক্লাস জায়গা, দার্জিলিং এর চাইতে দশগুণ বেশি সুন্দর। গ্যাংটক যে সুন্দর তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমি সেখানে যেতে পারি না। ধরা পড়লে কোন কথা নেই, সোজা জেল হয়ে যাবে। এই তথ্য আসার আগেই জোগাড় করেছিলাম। সিকিম যেতে বিদেশিদের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন। আমি সেই অনুমতি নিয়ে আসিনি। এদিকে আমি যে কলকাতা থেকে না, ঢাকা থেকে এসেছি, এই তথ্য আগ বাড়িয়ে একে দিতেও চাচ্ছি না। তাই কিছু না বলে আশেপাশে গাড়ির খোঁজে পা চালালাম।

আমার সাথে দশ বারো জনের একটা দল। সবাই দার্জিলিংই যাবে। শেষ পর্যন্ত একটা জিপের ড্রাইভারকে আমরা বোঝাতে পারলাম যে দার্জিলিং পৌঁছানোর আগেই বন্দ্‌ শেষ হয়ে যাবে। আমরা সমস্যা ছাড়াই যেতে পারব। সে প্রতি সিট আশি রুপি হাঁকল। সবাই তাতেই রাজি। ড্রাইভারের পাশে তিনটা সিট, আমরা দু’জন তিনটাই ভাড়া করলাম। দুটোতে আমরা দু’জন বসব, আর একটায় ব্যাগ রাখতে সুবিধা হবে। সাড়ে দশটায় শুরু হল আমাদের যাত্রা। আমি বসেছি জানালার পাশে। দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল। মফস্বলি ভাব মুছে গিয়ে শুরু হল অসাধারণ সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। কি একটা হলদে ফুলে ছেঁয়ে আছে আশপাশের সব পাহাড়। রাস্তার পাশেই একেবারে জিপের চাকা ঘেঁষে ফুটে আছে নাম না জানা বেগুনী, হলুদ, কমলা রঙের ফুল। জিপ ছুটে চলেছে। বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেছে মাথার চুল।

আবার দার্জিলিং-পর্ব ৩

বুক ভর্তি করে বাতাস টেনে নিলাম, এরকম বাতাস তো আমার ঢাকাই ফুসফুস পায়নি কখনো। একটা অদ্ভুত পাহাড়ি বুনো ফুলের গন্ধে মেতে আছে চারদিক। বহ্নির দিকে তাকালাম, সে-ও একটা ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছে দূরের একটা পাহাড়ের দিকে। ঠিক এই সময় আমার একটা ভ্রম হল। জীবনে কিছু অবর্ণনীয় আনন্দের মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় অনেক হয়েছে, এই বার এই ক্ষণে পৃথিবী থেকে হাসি মুখে বিদায় নিয়ে নিই। আমারও সেরকম মনে হতে লাগল। আমার মনে হল, এই তীব্র আনন্দ সহ্য করার মত স্নায়ু আমার নেই। থাকার দরকারও নেই। এখনই একটা লাফ দিয়ে এই পাহাড় থেকে আমি পড়ে যাই। কেউ যেন কখনও আমাকে আর খুঁজে না পায়।

দার্জিলিংয়ের রাস্তা ধরে আসতে আসতে আমার দার্জিলিং জমজমাট গল্পের সেই অংশটুকুর কথা মনে পড়ে গেল। সোনাদা এলে লালমোহনবাবু তাঁর রাজস্থান থেকে কেনা কান-ঢাকা চামড়া আর পশমের টুপিটা মাথায় চাপিয়ে নিলেন। কার্সিয়ং রেলওয়ে রেস্তোরাঁতে চা খাবার সময় ভদ্রলোক জানালেন যে, তিনি এই প্রথম দার্জিলিং-এ চলেছেন। ফেলুদার চোখ কপালে উঠে গেল। বলল, “ইস্—আপনাকে প্রচণ্ড হিংসে হচ্ছে। প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার যে কী অদ্ভুত অনুভূতি, সেটা তো আমাদের মধ্যে একমাত্র আপনিই বুঝবেন”। পথে আসতে আসতে আমার অবস্থা ঠিক লালমোহনবাবুর মতই। কতবার যে ‘বাহ্’ বলেছি আর কতবার যে গাড়ির পাশে গভীর খাদ দেখে ভয়ে সিঁটকে গেছি হিসেব নেই। জীবনে কোনদিন দেখেছেন বাড়ির গায়ে নাম্বারের পরিবর্তে হাইট লেখা আছে? কার্সিয়ং এ ওঠার পর স্টেশনের পাশের একটা বাড়ি, সম্ভবত টিকেট ঘর, তার গায়ে দেখি লেখা ‘কার্সিয়ং’। সাথে বড় করে লেখা রয়েছে উচ্চতা ৪৮৬৪ ফিট। আমাদের হোটেল ‘দা মেইন বেলেভিউ’ এর অবস্থান যাকে বলে একেবারে হার্ট অব দার্জিলিং, সেই ম্যালের ঠিক ওপরেই।

হোটেলে পৌঁছে আনন্দে আমার বত্রিশ পাটি দাঁত বেরিয়ে গেল। বেশ বড় রুম। বেশ বড় একটা বিছানা। কাঠের পাত বিছানো মেঝে। বড় একটা বাথরুম। জানালার পর্দা সরালেই ম্যাল দেখা যাচ্ছে। আর কি চাই? পরে বুঝেছিলাম লোকেশন ছাড়া হোটেলটার আর ভাল কিছুই নেই। গোসল করার জন্য কল থেকে গরম পানি বেরুচ্ছে না দেখে ম্যানেজারকে ডাকলাম। সে বলল, পানি আভি আতা হ্যায়। আভি আতা হ্যায় এর মানে বুঝলাম বিশ মিনিট পর। একটা লোহার বালতিকে টেনে হিঁচড়ে এক বালক জিভ বার করে ঘরে ঢুকল। বালতিতে গরম পানি। যতবার গরম পানি লাগবে ততবার এভাবেই পানি চাইতে হবে নাকি? সর্বনাশ! বহ্নির দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখ থমথম করছে। আমি তখন প্রস্তুত হচ্ছি শতাব্দীর সেরা ধমকটা শোনার জন্য। হোটেল নিয়ে রিসার্চ করেছি আমি। এই রকম একটা হোটেল বুক করব সেটা নিশ্চয়ই ছিল তার ধারণার বাইরে, বিশেষ করে যেখানে সে বাথরুমের ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে। আমার ধারণা সব মেয়েরাই এই ব্যাপারটায় সেনসিটিভ হয়। রাতের বেলা দেখি আরেক ফ্যাসাদ। সোয়েটার পরে, মোজা পরে কম্বল টম্বল গায়ে চাপিয়ে শুয়েছি। অথচ দেখি কনকনে ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। এই বাতাসের উৎস কি? খুঁজতে গিয়ে দেখি জানালা খোলা। অথচ স্পষ্ট মনে আছে আমি নিজে জানালা বন্ধ করে শুয়েছিলাম। কি আর করা, আবার জানালা লাগিয়ে শুলাম। একটু পরে দেখি আবার ঠান্ডা বাতাস এবং জানালা যথারীতি খোলা। ভাল করে দেখে বুঝলাম জানালার লকটা একটু বাতাসেই অটোম্যাটিক খুলে যায়। যত শক্ত করেই লাগাই না কেন, কোন লাভ হচ্ছে না। এভাবেই ঘুমোতে হবে। পরে যতবার দার্জিলিং এ গেছি, হোটেলটার দিকে তাকিয়ে আমরা সেই রাতের কথা স্মরণ করেছি। উফ্‌, কি ভয়ংকর রাতই না গেছে!

পরের দিন আমরা বাতাসিয়া লুপ, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনিস্টিটিউট, দার্জিলিং জু সহ কমন যে সব জায়গা সবাই দেখে সেগুলো ঘুরলাম। সাথে ম্যালে হাঁটা তো ছিলই। আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছিল দার্জিলিং জু। যদিও আমি জু কনসেপ্টটা থেকেই সরে এসেছি অনেকখানি, কারণ আমার মতে চিড়িয়াখানা একটা প্রাচীন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার, তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তার পরেও বলতে হবে এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চিড়িয়াখানা এর আগে আমি কোথাও দেখিনি। এখানে হিমালয়ান রেঞ্জে পাওয়া যায় এমন সব পশু পাখিদের রাখা হয়েছে। একটা ভাল্লুকও আছে সেখানে। আমরা তার সাথে পরিচিত হলাম। ওর নাম অরুণা। এখনও যখন যাই, একবার অরুণার খোঁজ করি। শেষ যেবার গেলাম দেখলাম বেচারা হাঁচি দিচ্ছে। নাক দিয়ে পানি পড়ছে। বেশ ঠান্ডা লেগেছে তার।

টাইগার হিলে যাই আমরা এর পরের দিন, সূর্যোদয় দেখার জন্য। এটা আসলে এমন একটা অভিজ্ঞতা, যেটা আমার পক্ষে লিখে বোঝানো সম্ভব না। আমি শুধু এতটুকু বলব, যখন মেঘ কেটে গিয়ে তীব্র সূর্যের আলোটা কাঞ্চনজঙ্ঘার উপরে এসে পড়ল, ইট ওয়াজ এ ব্রেথ টেকিং মোমেন্ট ফর আস।

দার্জিলিং এ যাব, আর কেভেন্টারস্‌ এ বসে হট চকোলেট খাব না, তা তো হয় না। সুতরাং চলো কেভেন্টারস্‌। হট চকোলেট এর গ্লাসটা হাতে ধরে আমি ইমোশনাল হয়ে গেলাম। এই সেই কেভেন্টারস্‌, যেখানে সত্যজিৎ রায় এসেছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার শুটিং এর জন্য। ফেলুদার পছন্দের জায়গাও ছিল কেভেন্টারস্‌। কেভেন্টারস্‌ এর হট চকোলেট আর কাঁসুন্দি দিয়ে চিকেন সসেজ আমার অলটাইম ফেবারিট।

আবার দার্জিলিং-পর্ব ৩

২০১০ সালে আমরা চারদিন দার্জিলিংয়ে থেকেছিলাম। ফিরে আসার আগের দিন বিকেলে আমরা শেষবারের মত ম্যালে হেঁটেছি। হোটেলের প্রতিটা রাত আমাদের খারাপ ঘুম হয়েছে। যত ভাল প্লেসেই বেড়াতে যাইনা কেন, আর যত সুন্দর সুন্দর জায়গাতেই ঘুরিনা কেন, ঘুম খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর। ঠিকমত ঘুম না হলে কোনকিছু উপভোগ করা কঠিন। বিকেলে ম্যালে হাঁটছিলাম আর হোটেলটার অব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছিলাম। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ম্যানেজারের উপর। ম্যানেজার থেকে গুগলের উপর। আর তারপর রাগ হলো পুরো দার্জিলিং এর প্রতি। মনে হল এ-ই শেষ। আর দার্জিলিং আসব না কোনদিন। বিষণ্ণ হয়ে দু’জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি রেলিং ধরে। মাথার মধ্যে বাজছে অঞ্জন দত্তের গান, খাদের ধারের রেলিং টা…। কুয়াশা ভেসে আসছে চারদিক থেকে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে।

আবার দার্জিলিং-পর্ব ৩

এমন সময় টুংটাং করে একটা ঘন্টার আওয়াজ বেজে উঠল কোথাও। তারপর সুরেলা কন্ঠে বাচ্চাদের সমবেত একটা কোরাস ভেসে আসতে থাকল। ভাল মত তাকিয়ে দেখলাম, অ-নে-ক অ-নে-ক নীচে… সম্ভবত একটা বোর্ডিং স্কুল। বাচ্চারা সেখানে প্রার্থনা সংগীত গাইছে। সেই গানের সুর এমন যে আমার বুকের ভেতর হাহাকারের মত লাগল। মনে হতে লাগল, এইখানে, এই ক্ষণে কেউ নেই, কিছু নেই। আছি শুধু আমরা দু’জন আর অনন্ত মহাকাল। আমি বহ্নির দিকে তাকালাম। দেখি সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা দুজনেই আসলে তখন একটা কথাই ভাবছিলাম। এই সুর, এই ঘণ্টার টুংটাং ধ্বনি, এই খাদের ধারের রেলিং আমাদের এত সহজে ছাড়বে না। এই যাত্রা শুরু হল মাত্র। আমাদের ফিরে আসতেই হবে এখানে। বারবার।

দার্জিলিং টিপসঃ

০১. বাংলাদেশ থেকে বাই রোডে অনেকভাবে দার্জিলিং যাওয়া যায়। চাইলে এয়ারেও কলকাতা হয়ে যেতে পারেন। বাই রোডে গেলে আপনাকে আগে পৌঁছাতে হবে শিলিগুড়ি। আগে বুড়িমারি সীমান্তটাই সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত হত শিলিগুড়ি যাবার জন্য। তবে কিছুদিন থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরটা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।

০২. শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার্ড জিপ কিংবা পুরো একটা গাড়ি ভাড়া করে দার্জিলিং যাওয়া যেতে পারে। শেয়ার্ড জিপের ভাড়া হতে পারে ১৫০ রুপি থেকে ২০০ এর মধ্যে। কার কিংবা জিপ পুরো ভাড়া করে যেতে খরচ পড়তে পারে ২০০০ থেকে ২৩০০ রুপি।

০৩. আপনি যদি শুধুমাত্র দার্জিলিংয়ের দ্রষ্টব্য জায়গাগুলো ঘুরতে চান, তাহলে তিন রাত দার্জিলিংয়ে থাকাই যথেষ্ট। যেদিন দার্জিলিং পৌঁছোবেন সেদিন বেলা পড়ে যাবার জন্য হয়ত তেমন কোথাও যেতে পারবেন না। সেইদিনটা ম্যালে ঘুরুন। আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করুন। পরের দুই দিন দুই দফায় বাতাসিয়া লুপ, ঘুম মনাস্ট্রি, টিবেটান রিফিউজি ক্যাম্প, দার্জিলিং চিড়িয়াখানা, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, রক গার্ডেন, রামকৃষ্ণ মিশন, হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট, রোপ ওয়ে, টাইগার হিলসহ আরো যেসব জায়গা আছে ঘুরে দেখতে পারেন। একদিনে যদি এসব দেখতে চান সেটাও সম্ভব, তবে অনেক বেশি পরিশ্রম হয়ে যাবে এবং শুধু সেলফি তোলাই হয়ত হবে, এনজয় করতে পারবেন না।

০৪. টাইগার হিলে ঘোরার জন্য কিন্তু অনেক সকালে উঠতে হয়। আপনি দার্জিলিং ক্লকটাওয়ারটার আশে পাশে অনেক ট্যাক্সি পাবেন। তাদের সাথে আগের দিন চুক্তি করে নেবেন পরের দিনের ট্রিপের জন্য। একেকজন একেকরকম চাইবে। সাধারণত ১০০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে হোটেল থেকে টাইগার হিল যাওয়া, বাতাসিয়া লুপ ঘোরানো, এবং হোটেলে ফেরত আসার খরচ হয়ে যাবার কথা। এর চাইতে কম বা বেশি লাগতে পারে, নির্ভর করছে কোন সীজনে যাচ্ছেন তার উপর।

০৫. দার্জিলিংয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটা ব্যাপার হচ্ছে টয় ট্রেন। মনে রাখবেন, টয় ট্রেনের টিকিট পাওয়া বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। যদি দলে ভারি হন, তাহলে যেদিন এই ট্রেনে চড়তে চান, তার আগের দিন টিকিট কেটে রাখাই ভাল। টিকিট পাবেন দার্জিলিং স্টেশনে। মনে রাখবেন, টয় ট্রেনের টিকিট বেশ এক্সপেনসিভ, এখন মনে হয় জনপ্রতি ১২৮৫ রুপি করে। এই টাকায় আপনি দার্জিলিং স্টেশন থেকে ঘুম স্টেশনে যাবেন, বাতাসিয়া লুপে ঘুরবেন, ঘুম মিউজিয়ামে ঘুরতে পারবেন, এবং দার্জিলিংয়ে ফিরে আসবেন। সব খরচ এই টিকেটের মধ্যেই থাকবে। একটা তথ্য দিই, ঘুম হচ্ছে ইন্ডিয়ার শুধু না, এই অঞ্চলের সবচাইতে উঁচু হিলস্টেশন যার উচ্চতা ৭৪০৭ ফুট। ভাবা যায়!

০৬. দার্জিলিংয়ের ড্রাইভাররা আপনাকে নিয়ে ঘুরবে ‘পয়েন্ট’ হিসেবে। তাদের ভাষায় একেকটা ট্যুরিস্ট স্পট হচ্ছে একেকটা পয়েন্ট। তিন পয়েন্ট, চার পয়েন্ট, পাঁচ পয়েন্ট এভাবে তারা হিসেব করে ভাড়া চায়। আপনি চাইলে তাদের সিস্টেমেও যেতে পারেন, আবার চাইলে সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে পারেন। তবে আমার মতে যদি প্রথমবার দার্জিলিং যান, তাহলে ওদের উপরই ঘোরানোর দায়িত্বটা ছেড়ে দেবেন। ওরাই আপনাকে যা যা দেখার আছে ঘুরিয়ে দেখাবে। আর ভাড়া নিয়ে দামাদামি করতে পারবেন এটা ঠিকই, কিন্তু বলে রাখা ভাল দার্জিলিংয়ের স্থানীয় লোকেরা দামাদামিতে আমাদের মত একেবারেই এক্সপার্ট না। আপনি যদি অতিরিক্ত দামাদামি করতে চান, ওরা মুষড়ে পড়বে, হয়তো আর যেতেই চাইবে না। তাই ওরা যা চায়, ধরে নিতেন পারেন ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে একই ভাড়া আপনাকে বাকি সবাই বলবে।

০৭. দার্জিলিং এ সব মৌসুমে যাওয়া যায়, একেক মৌসুমে এর একেক রূপ। মার্চের শেষ থেকে জুলাই পর্যন্ত মাঝেই মাঝেই বৃষ্টি হয়। পথঘাটও পিচ্ছিল হয়ে যায়। তাই এই সময় এলে রেইনকোট আর ছাতা সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। তাপমাত্রা থাকতে পারে ১৬ থেকে ২৬ ডিগ্রি। আগস্ট থেকে বৃষ্টিটা একটু কমে। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত বেশ ঠান্ডা থাকে। ডিসেম্বরের শেষে কোন কোন দিন তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রিতেও নেমে যেতে পারে। এই সময়টায় দার্জিলিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকে অনেক বেশি ট্যুরিস্ট আসে। তাই হোটেল ভাড়াও তূলনামুলকভাবে বেশি থাকে। আপনার যদি ঠান্ডা পছন্দ হয়, ফেস্টিভ্যাল পছন্দ হয়, রঙবেরঙের মানুষ দেখতে আপনি ভালবাসেন, তাহলে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি হবে আপনার জন্য দার্জিলিং ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বলে রাখা ভাল, যতই ঠান্ডা পড়ুক দার্জিলিংয়ে স্নো-ফল হয় না বললেই চলে। অতীতে অনেক হলেও দার্জিলিংয়ে বর্তমানে স্নো-ফল খুব রেয়ার ঘটনা। তাই আপনি যদি স্নো-ফল দেখবার আশায় দার্জিলিং যেতে চান, সম্ভবত আপনাকে আশাহত হতে হবে।

আবার দার্জিলিং-পর্ব ৩

০৮. দার্জিলিং এ হোটেল অনেক রকমের, অনেক রেটের আছে। রুচি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আপনি থাকতে পারেন। এখানে মে ফেয়ারের মত অতি উঁচু মানের হোটেল যেমন আছে, আবার এমন অনেক হোটেল আছে যেগুলোর নাম পর্যন্ত আপনি গুগোলে পাবেন না। মনে রাখা ভাল যে কোন হোটেলই আপনাকে একই রেটে সারাবছর রুম দেবে না। যে হোটেল এপ্রিলে আপনাকে ১৫০০ টাকা পার নাইট রুম দেবে, তারাই হয়ত ডিসেম্বরে সেই একই রুম অফার করবে ৩০০০ টাকায়। রুমের ট্যারিফটা মৌসুম এবং বুকিং ভল্যুমের উপর নির্ভর করে। আমি অ্যাডভেঞ্চারাস ট্রাভেলার না। আমি বেড়াতে যাই রিল্যাক্স করার জন্য। তাই আমি এমন হোটেল বেছে নিই যার রুম পরিষ্কার, বাথরুম পরিষ্কার, ম্যালের যতটা সম্ভব কাছে, ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা আছে, এতটুকুই। অনেককে দেখি রুম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা নিয়ে বেশ মাতামাতি করে। আমার কথা হল, আপনি দার্জিলিংয়ে এত পয়সাপাতি খরচ করে হোটেলের রুম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবার জন্য নিশ্চয়ই আসেন নি। সেজন্য তো এত বড় ম্যালই পড়ে রয়েছে। এই ব্যাপারটাকে আমার সবচাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তবে এখানেও আপনার অভিরুচি।

০৯. দার্জিলিংয়ে খাবার জায়গার কোন অভাব নেই। এবং আপনি ভাত থেকে শুরু করে সব ধরণের খাবারই পাবেন। তবে প্রতিটা শহরের, প্রতিটা জায়গার লোকাল কুজিন আছে। আপনি যদি দার্জিলিংয়ে গিয়ে পিৎজা হাটের পিৎজা খেতে চান, কেউ নিশ্চয়ই আপনাকে আটকাবে না। তবে যদি পিৎজা না খেয়ে কুংগা রেস্টুরেন্টের মোমো, গ্লাস নুডলস্‌, চাউমিন, স্যুপ খান, কেভেন্টার্স এর ছাদে বসে হট চকোলেট, সসেজ খান, নাথমুলস্‌ কিংবা গোল্ডেন টিপস্‌  এ বসে দার্জিলিং চা খান, আর গ্লেনারিজ এ বসে ডিনার করেন, তাহলে বলতে পারবেন আপনি দার্জিলিং এর খাবারের স্বাদ পেয়েছেন। আরো অনেক অনেক রেস্টুরেন্ট আছে, আপনারা চাইলে ট্রিপ অ্যাডভাইজরের সাহায্য নিতে পারেন।

১০. উপরে যেমনটি বলেছি, দার্জিলিং এর দ্রষ্টব্য যা কিছু আছে তা দেখে ফেলার জন্য তিন রাত যথেষ্ট। কিন্তু দার্জিলিংকে প্রকৃতভাবে পেতে কতদিন যথেষ্ট তা আমার নিজেরও জানা নেই। আমি কতবার দার্জিলিং গেছি সেই সংখ্যাটা এখানে বলতে চাই না। কিন্তু যতবার গেছি, দার্জিলিং একেকবার একেক রূপে আমার কাছে ধরা দিয়েছে। এমনও হয়েছে আমরা সাত দিন থেকেছি এবং সাতদিনই ঝকঝকে আকাশ পেয়েছি। সারাদিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ আস্বাদন করেছি। আবার এমনও হয়েছে যতদিন ছিলাম, একবারের জন্যও শৈল-নন্দিনী তার ঘোমটা তোলেননি। মেঘের আড়ালে আড়ালেই থেকেছেন। সুতরাং দার্জিলিংয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনও একটা লাকের ব্যাপার। তবে আপনার জন্য চান্স নেবার সবচাইতে বেস্ট টাইম হচ্ছে ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির শেষ। এই সময় আকাশ প্রায় পুরোটাই মেঘমুক্ত থাকে। তবে এটাও মনে রাখবেন, মেঘের আলো ছায়ার মধ্যে কাঞ্চনজঙ্ঘার যে রূপ সেটা আপনি এই সময় পাবেন না।

১১. কেনাকাটার জন্য দার্জিলিং চমৎকার বিশেষ করে দার্জিলিংয়ের উলেন বিখ্যাত। শাল কিংবা হাল ফ্যাশানের স্ট্রল পাবেন অনেক কম দামে। হাতে বুনন করা কানটুপি আর বাচ্চাদের রঙিন উলেন জ্যাকেট খুবই কম দামে পাবেন। তবে একটা ব্যাপার, ম্যাল রোডে যেসব দিদিরা বসেন, মনে রাখবেন তারা খুবই কম প্রফিটে বিক্রি করেন। এদের সাথে খুব বেশি দরদাম করতে যাবেন না, তারা মনে কষ্ট পেতে পারেন। দার্জিলিংয়ের স্থানীয়রা খুবই হাসিখুশি আর সৎ, তারা আপনাকে ঠকাবেনা এই বিশ্বাসটা রাখতে পারেন। কেনাকাটার একটা সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, ম্যাল রোডের উপর দোকানগুলোতে একটু বেশি দাম, আর একই জিনিস লোয়ার বাজার সংলগ্ন মার্কেটগুলোয় কিছুটা কম দামে পেতে পারেন। আপনার যদি কিউরিও কালেকশনের শখ থাকে তাহলে ম্যালের উপরে বেশ কিছু কিউরিও শপ আছে, ঢুঁ দিতে পারেন, যদিও দাম বেশ চড়া। চা কিনতে চাইলে সবাচাইতে ভালো পাবেন গোল্ডেন টিপস এবং নাথমুলস এ। এখানে চা খাবার ব্যবস্থাও আছে। চায়ের দাম প্রতি কেজি ২০০ রুপি থেকে ২০০০০ রুপিও পাবেন।

সুতরাং, আর কি? প্ল্যান করুন, স্বপ্ন দেখুন, অপেক্ষা করুন এই মহামারী শেষ হবার জন্য, তারপর বেরিয়ে পড়ুন শৈল শহর দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য।

(সমাপ্ত)

সারাবাংলা/এসএসএস





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *