বরিশালের চিকন কাঁথা


ফারজানা সুলতানা দিনা

নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই বরিশাল তথা দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে ব্যবহৃত কাঁথার সাথে। নকশি কাঁথা যশোর স্টিচ বা উত্তরাঞ্চলের কাপড়ের মোটা কাঁথার পাশাপাশি দক্ষিণ অঞ্চল সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা জুড়ে যে কাঁথা নিত্য ব্যবহৃত হয় তারও একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আর স্বকীয়তা আছে। আর তা হলো এই সব এলাকার কাঁথাগুলো প্রথমত হালকা ও পাতলা হয়ে থাকে। দুই পরতের পাতলা কাঁথাগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করবেন— এর সেলাই শৈলীর দিকে। মিহি মিহি ফোড় দিয়ে জ্যামিতিক ডিজাইনে এক সুতার টানে নকশাগুলো হয়ে থাকে। সাধারণত সুতি নরম শাড়ি দিয়ে কাঁথাগুলো তৈরি হয়। এসব কাঁথার সূক্ষ্মতা আর নিপুণতা বজায় রাখতে ফুল তোলার সুতা শাড়ির পাড় থেকে সংগ্রহ করা হয়।

ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশ, তার বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁথা বিভিন্ন রকমের বৈশিষ্ট্য বহন করে। এর মূল কারণ হলো আবহাওয়া। উত্তরাঞ্চলে শীত বেশি বলে সেখানের কাঁথা মোটা হয়। কাপড়ের প্রলেপ বেশি থাকে। পক্ষান্তরে দক্ষিণাঞ্চলে আবহাওয়া শীতকালে যেমন খুব বেশি শীত থাকে না তেমনি গরমেও নদী ও সমুদ্রের কাছে বছরের বেশির ভাগ সময় একটা মধ্যম অবস্থা বিরাজ করে। একারণে এসব অঞ্চলে সারা বছর এসব কাঁথা ব্যবহার হয়। তাই এই কাঁথার আরেকটি নাম আমি দিয়েছি “সামার কাঁথা”।

বরিশালের চিকন কাঁথা

সারাবছর বিছানায় বালিশের সাথে একটা হালকা কাঁথা ভাজ করে দিয়ে রাখা হয়। এক সময় বাড়ির মেয়েরা এই কাঁথার নিপুণতার প্রতিযোগিতা করত। চৈত্র, বৈশাখ মাস সময়টাই হলো কাঁথা তৈরির আসল সময়। আবার পৌষ মাসে কাঁথা সেলাই করা হয় না বা এসময়ে সেলাই করা নিয়ে একটি সামাজিক ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞা মানা হয়। কাঁথা নিয়ে আরেকটি  ট্যাবু হলো ছেলেরা কাঁথা সেলাই এ হাত দেবে না।  ফোড়ের ধরন অনুযায়ী কাঁথা সেলাইতে ডান থেকে বামে সেলাই উঠাতে হয়। কালের পরিক্রমায় এসব নিয়ম অবশ্য আর অতোটা মানা হয় না। তবে আসল শিল্পটি প্রয়োজনের খাতিরে এখনও চলমান আছে। বাড়ির মাটির দাওয়ায় চার কোনা করে খুটো গেঁথে খেজুর কাটা দিয়ে গেঁথে শক্ত একটা ফ্রেম করে নেয়। কয়েক বার ব্যবহৃত শাড়ি পাড় আলাদা করে দুই ভাগে ছিড়ে নিয়ে কাঁথার জন্য কাপড় প্রস্তুত করা হয়। একটি বড় কাঁথায় দু’টি শাড়ি প্রয়োজন হয়। আর ভেতরে দিতে হয় একটি পাতলা এক প্রস্থ কাপড়। এর পর লম্বা লম্বা ফোড় টেনে চার ধার মিলিয়ে এবং কাঁথার ভেতরেও লম্বা লম্বা অস্থায়ী সেলাই দিয়ে কাঁথা আটকানো হয়। একে বলে কাঁথা পারা বা কাঁথা সেলাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা। এর পর এতে পছন্দ মতো নকশা আঁকা হয়। নকশাতেও থাকে কিছু নিয়ম কানুন। আছে ভিন্ন ভিন্ন নামের ফোড়। আবার এসব ফোড়ের ধারণা আসে আশেপাশের ফুল পাখি লতার নাম থেকে। যেমন কচুরি পাতার ফুলকে এ অঞ্চলের মানুষ বলে হুডি ফুল। তাই এই নকশার নাম হুডি। এছাড়া আছে বগা, মুক্তা, পুতি, ভরাট, মাছ কাটা, মৌচাক, ধার, কেঁচি কাটা, পাতা চৌচালা এরকমের নানান রকমের নাম। চার পাশের ফ্রেমে থাকে কিছু দূর পর পর তিনটে বা দু’টো চেইন ফোড় দিয়ে সোজা ফোড়ের ডবল লাইন সেলাই। আর ভেতরে কাঁথা ঠিকভাবে আটকে থাকার জন্য কিছু কাঠামোগত ডবল লাইন লম্বা সেলাই। এরই মাঝে বিভিন্ন নকশায় কাঁথার নান্দনিক রূপ দেওয়া হয়। এসব কাঁথার সেই নকশা বা ফুলেও থাকে বিশেষ কিছু ধারা। নকশার মাপ আর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নকশাটি একটি কাগজে একে কেটে ফ্রেম তৈরি করে নেওয়া হয়। এরপর সেই ফ্রেম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বসিয়ে পুরো কাঁথাজুড়ে একে ফেলা হয় কাঁথার নকশাটি। নকশা আঁকা শেষ হলে শাড়ি থেকে আলাদা করা পাড় থেকে সাবধানে সুতা খুলে খুলে পচিয়ে গুটি পাকিয়ে সংগ্রহ কড়া হয় নকশার সেলাইয়ের জন্য সুতা। এর পর ফ্রেম থেকে কাঁথাটি খুলে নিয়ে দুপুরের খাবার পরে বাড়ির বউ ঝি এরা পানের বাটা সাথে নিয়ে গল্প করতে মেতে ওঠেন কাঁথা সেলাই করতে। হাতে হাতে সুই সুতোর খেলায় গল্পে সম্পূর্ণ হয়ে আসে এক একটি কাঁথা।

বরিশালের চিকন কাঁথা

কাঁথায় সামাজিক স্তর বিন্যাস
কাঁথার নকশায় আছে সমাজের স্তর বিন্যাসের একটি সূক্ষ্ম প্রতিচ্ছবি। অবস্থাপন্ন পরিবারের কাঁথাগুলোর নকশায় অতিমাত্রায় সূক্ষ্ম শৈলী বজায় রাখা হয়। পক্ষান্তরে নিম্নবিত্ত পরিবারের কাঁথাগুলো সোজা সেলাই আর মোটা ফোড়ের হয়ে থাকে। কাঁথার কাপড়ের ঘনত্ব ও আর সচ্ছল পরিবারের মতো পাতলা থাকে না। কিছুটা মোটা ও ভারী হয়ে থাকে। কারণ তার এই একটি কাঁথাই হয়ত বেশি শীতের একমাত্র সম্বল। এই ছিল বাড়ির গল্প।

বরিশালের চিকন কাঁথা

তবে সময়ের সাথে সাথে মানুষের ব্যস্ততা ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কাঁথাশিল্প আস্তে আস্তে একটি পেশাদার রূপ পায়। লেখা পড়া বা অন্য কাজের যুক্ততার কারণে সব বাড়ির মেয়েরা এখন আর কাঁথা তৈরিতে সময় পায় না। আবার এক দল নারী এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছেন তাদের অর্থনৈতিক উৎস হিসেবে। কাঁথা সেলাই এখন একটি আলাদা পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যুক্ত হয়েছে মজুরি। মিলেছে এর একটি পেশাদারিত্বের মর্যাদা।

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: