মহামারিতে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা: যেসব বিষয়ে সচেতনতা জরুরি


শাহীনূর সরকার

করোনাভাইরাস, লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব— বর্তমান পৃথিবীতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত এই তিনটি শব্দ। আর শব্দগুলোর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ শব্দগুচ্ছটিও। কেননা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে যারা শারীরিকভাবে সেরে উঠছেন, তাদের অনেকেরই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হলেও যারা দীর্ঘদিন ধরে ঘরবন্দি হয়ে থাকছেন, মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদেরও।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়া প্রতি তিন জনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের চিকিৎসকরাই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ওই গবেষণাটি বলছে, করোনা আক্রান্ত হওয়ার কয়েক মাস পর থেকে প্রতি তিন জনে একজনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যা শুরু হয়।

এক্ষেত্রে আমাদের দেশের পরিস্থিতি কী? বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এমন জটিলতায় পড়তে হচ্ছে করোনায় আক্রান্ত কিংবা ঘরবন্দিদের?

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চিকিৎসক ডা. মোহ্তাশাম হাসান বলেন, ‘করোনা পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থাও ভিন্ন কিছু নয়। হাসপাতালে আগের চেয়ে মানসিক রোগীর চাপ এখন অনেক বেশি। বেশিরভাগ রোগীরই করোনা ভালো হওয়ার পরও শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু মেডিক্যাল পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়ছে না। তার অর্থ— করোনার সময়ে তার যে শ্বাসকষ্ট হতো, যে কষ্ট হতো, সেখান থেকে সে আর বেরিয়ে আসতে পারছে না।’

ডা. মোহ্তাশাম আরও বলেন, ‘আগে যেখানে ভয়-হতাশা সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে ৭০ শতাংশ রোগী আমাদের কাছে আসতেন, এখন তার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৯০ শতাংশ। এসব রোগীদের সাধারণ কিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে— ভয়ে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া, নিঃশ্বাস নিতে না পারা, দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি। অনেকের মধ্যেই মৃত্যুচিন্তাও চলে এসেছে। বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। করোনা আক্রান্ত হওয়ার সময়কার দুঃসহ স্মৃতি তারা ভুলতে পারছে না। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।’

ডা. মোহ্তাশাম বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে আসা মানসিক রোগী আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। যাদের আগে হতাশা ছিল, এখন তা বহুগুণে বেড়ে গেছে।’ এছাড়া মানসিক উদ্বেগ, শুচিবায়গ্রস্ততায় আক্রান্ত রোগীদের সমস্যাও করোনার সময়ে বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

এই সময়ে ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী ও মাঝবয়সীরা বেশি মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানান এই চিকিৎসক। আবার যাদের অ্যাজমা বা শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন আছে, এমন রোগীদেরও মানসিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার হার বেশি। করোনায় এসব রোগীদের মুত্যুঝুঁকি বেশি থাকে বলে তারা ভয়ে থাকেন— বলছেন ডা. মোহ্তাশাম।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

আমাদের দেশে বরাবরই মানসিক স্বাস্থ্য ও এর চিকিৎসার ব্যাপারে বেশিরভাগ পরিবারই উদাসীন। অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্যকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে চান না।

ডা. মোহ্তাশাম বলেন, ‘মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনো আমরা স্বাভাবিকভাবে দেখি না। সে কারণে সচেতনতাও কম। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। করোনার সঙ্গে যে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে, এটি মানুষ বুঝতে পারছে।’

তাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগে কেউ সুস্থ-স্বাভাবিক থাকলেও করোনা সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর যদি তার মধ্যে মৃত্যুচিন্তা, অবসাদ, ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, ঘুম না হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে পরিবারকে ভাবতে হবে। এ ধরনের সমস্যাগুলো কারও মধ্যে দেখা দিলে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকের কাছে তাকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ডা. মোহ্তাশাম।

আবার যাদের আগে থেকেই মানসিক রোগ ছিল, করোনা সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর সেই রোগ বেড়ে গেলেও তার মানসিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ডা. মোহ্তাশাম বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে রোগীর সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

বাড়িতে কি চিকিৎসা সম্ভব?

যাদের সাময়িক হতাশা, দুশ্চিন্তা, অবসাদ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাদের ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব বলে জানান ডা. মোহ্তাশাম। সেইসঙ্গে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাবার, দিনে দুইবারের বেশি খবর না দেখার অভ্যাস করতে হবে। বাড়িতে কিছু সাইকোথেরাপিও নেওয়া যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ওষুধের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাড়িতে সুস্থ না হলে অবশ্যই মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

আর যাদের ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে, তাদের বাসায় রেখে চিকিৎসা সম্ভব না বলেই জানান বিএসএমএমইউ মনোরোগবিদ্যা বিভাগের এই চিকিৎসক।

পরিবার ও আশপাশের মানুষের ভূমিকা কেমন হতে পারে

করোনা ও লকডাউনের কারণে যেন করে কারও মধ্যে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে না পারে, সেজন্য পরিবার ও আশপাশের মানুষ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে ডা. মোহ্তাশাম বলেন, পরিবার ও আশপাশের মানুষের ধারণা থাকতে হবে করোনা কী ধরনের রোগ, কীভাবে ছড়ায় ও কীভাবে একে প্রতিরোধ করা যায়। প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো নিজেদের অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

তবে পরিবারের কারো করোনা হলে সেটা মেনে নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। বোঝাতে হবে, অন্যান্য রোগের মতো এটিও এক ধরনের রোগ এবং ওষুধের মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি সম্ভব। করোনা রোগীকে একেবারেই আলাদা করে রাখা উচিত নয়। বরং দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাকে যতটাসম্ভব মানসিক সমর্থন দিয়ে যেতে হবে।

করোনায় আক্রান্ত বা এর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন— এমন রোগীকে পরিবার ও কাছের মানুষের সংস্পর্শে থাকতে হবে। শারীরিকভাবে সম্ভব না হলেও ভিডিও কল বা অন্য ভার্চুয়াল মাধ্যমে হলেও সেটি করতে হবে।

করোনা রোগীকে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক বা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে বলে জানান ডা. মোহ্তাশাম। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পরিবারের সদস্যরা মনে করলে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যেতে হবে। সেটিও শারীরিকভাবে সম্ভব না হলে ভার্চুয়াল মাধ্যমে হতে পারে।

নজর দিতে হবে শিশু, প্রবীণ ও গর্ভবতীদের দিকে

মহামারি ও লকডাউনের কারণে ঘরে বসে থেকে বেশিরভাগ শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অহেতুক ভয়, দুশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে। এতে তাদের ঘুমের সমস্যা হচ্ছে ও শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। তাই বিশ্বের মহামারি পরিস্থিতি তাদের বোঝাতে হবে। সুযোগ থাকলে জনসমাগম কম— এমন খোলা মাঠ বা জায়গা মাস্ক পরে তাদের নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

করোনায় প্রবীণ ও ডায়বেটিক, রক্তচাপের মতো রোগ যাদের আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। সে কারণে তাদের অন্যদের থেকে একটু দূরত্বে রাখা প্রয়োজন। তবে সেটি করতে গিয়ে যেন ভয় বা আতঙ্ক বা একাকীত্ব তাদের গ্রাস করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘরে তাদের সঙ্গে যতটুকু সম্ভব স্বাভাবিক আচরণ করতে হবে।

শিশু-কিশোর ও প্রবীণদের মতো আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে গর্ভবতী নারীদেরও। তাদেরও সুরক্ষা যেমন দিতে হবে, তেমনি দিতে হবে মানসিক সমর্থন।

করোনাকালে মানসিক রোগীর যত্ন

মহামারিতেও মানসিক রোগীদের যত্ন আগের মতো করেই্ নিতে হবে। সেইসঙ্গে অভিভাবককে অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যই তাদের নিয়মিত ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে। একজন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। যেকোনো প্রয়োজনে তার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সেইসঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হবে। পৃথিবীতে মহামারি আছে— এটি তাদের বোঝাতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে এই মহামারিকে মেনে নিয়েই পৃথিবীতে চলতে হবে। আর তার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

সারাবাংলা/এসএসএস





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: