অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১


জাকির হোসেন

২০১৫ সালের জানুয়ারির এক সন্ধ্যা। আমাদের ক্লায়েন্ট সাপোর্ট ম্যানেজার শারমিন নিউইয়র্ক থেকে আমাকে স্কাইপে নক করল। একটা মিটিংয়ে ছিলাম। মিটিংটা শেষ করে তাকে কলব্যাক করলাম। কেমন আছেন, ভাল আছি টাইপ কথাবার্তা শেষ হবার পর আমাকে সে বলল, জাকির, আপনাকে সামনের মাসে ওয়ালথাম আসতে হবে এক মাসের জন্য। একটু ধাক্কা খেলাম। ওয়ালথামে (Waltham, Massachusetts) আমাদের ক্লায়েন্ট অফিস। আমরা তাদের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট দিচ্ছি বেশ অনেক বছর ধরে। নতুন একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে আমাদের কারো সেখানে যাবার দরকার ছিল। সেজন্য আমাদের দু’জন ডেভেলপার অলরেডি ওয়ালথামে আছে। সেখানে আমাকে দরকার হওয়ার কোনই কারণ নেই। শারমিনকে সেই প্রশ্নটাই করলাম যে আমাকে কেন যেতে হবে। জানলাম যে, সেখানে লিড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কিছু ডিজাইন ডিসকাশন আছে। কয়েকটা মিটিং আছে। তারমধ্যে একটা মাইক্রোসফটের সাথে একটা বেন্টলি ইউনিভার্সিটির ইউএক্স (UX) টিমের সাথে। ওরা চাচ্ছে আমি সেই মিটিংগুলো সেখান থেকে অ্যাটেন্ড করি। কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। সেই মুহূর্তে দেশের বাইরে কোথাও যাবার আমার ইচ্ছা ছিল না। চুপ করে থাকলাম। শারমিন বলল, আপনাকে এক্সাইটেড মনে হচ্ছে না কেন? আপনি কি এর আগে কখনো ইউএসএ গেছেন? বললাম, না আগে কখনো যাইনি। তবে যাবার কোন আগ্রহবোধও করছি না। কেন বলেন তো? শারমিন জানতে চাইল। বললাম, লং জার্নিতে আমার শারীরিক সমস্যা হয়, অসুস্থবোধ করি। তাছাড়া এখানে আমার অনেক পার্সোনাল কাজ আছে, মনে হয় না যেতে পারব।

ম্যানেজারের কাজ হচ্ছে ম্যানেজ করা। শারমিন আমাকে ম্যানেজ করতে থাকল। বলল, আরে টেনশনের কিছু নেই। দুই তিনটা মুভি দেখতে দেখতে আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই দেখবেন বোস্টন চলে এসেছেন। তাছাড়া, মাত্র তো একমাসের জন্য যাবেন, চিন্তা কি? তাড়াতাড়ি ভিসার জন্য অ্যাপ্লিকেশন করেন আর আমাকে জানান আপনার কিছু লাগবে কি না।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১
ওয়ালথামে টার্নার স্ট্রিটে আমাদের ক্লায়েন্ট অফিস

বুঝলাম সম্ভবত আমাকে যেতেই হবে। অফিস থেকে চিন্তিত হয়ে বাসায় ফিরলাম। অফিসে আমার যা কাজ তাতে আমাকে পাঠানোর চাইতে একজন সিনিয়র ডেভেলপার পাঠালেই চলে। আমাকেই কেন লাগবে বুঝলাম না। বাসায় এসে মেইল চেক করে দেখি আমাদের ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর একটা মেইল করেছে। কবে আসতে চাই সেটা জানাতে বলেছে যাতে আমার জন্য ক্লায়েন্ট অফিস থেকে একটা লেটার ইস্যু করতে পারে। আমি আমাদের সিটিওকে ফোন করলাম। বললাম, ভাই, তুমি তো জান অফিসের বাইরেও আমাকে কতরকমের ঝামেলা সামলাতে হয়। তাছাড়া আমি ইউএসএ গেলে আমার ওয়াইফকে একা থাকতে হবে বাসায়। দেখ না অন্য কাউকে পাঠানো যায় কি না? সিটিও বন্ধু মানুষ। সে বলল, স্যরি জাকির, আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু আমার হাতে কিছু নেই। আর এত চিন্তা কর কেন? মাত্র তো এক মাসের জন্য যাচ্ছ। এক মাসে মহাভারত উল্টে যাবে না। তুমি ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই কর।

নতুন জায়গা, নতুন দেশ দেখতে সবার ভাল লাগে। আমারও লাগে। তবে যারা আমার দার্জিলিং ঘোরাঘুরি সংক্রান্ত লেখালেখির সাথে কিছুটা পরিচিত, তারা জানেন যে আমার ঘোরাঘুরির সঙ্গী হচ্ছে বহ্নি। সারাজীবন যতবার যত জায়গায় ঘুরেছি, আমরা দু’জন একসাথে ঘুরেছি। ইউএসএ যাবার সব ব্যবস্থা আমার জন্য আমার অফিস করবে। বহ্নির জন্য ব্যবস্থা করতে হবে আমাকে। সেটা খুব সমস্যা না, কিন্তু আমি জানি বহ্নিকে আমি কোনভাবেই রাজি করাতে পারব না। ওর প্লেন জার্নিতে ক্লাস্ট্রোফোবিয়া টাইপ সমস্যা হয়। ছোটখাট জার্নিতে হয় না, তবে লম্বা জার্নিতে সমস্যাটা ধরা পড়ে। কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাবার প্লেন জার্নি মাত্র এক ঘন্টার। তাতেই সে অস্থির হয়ে ওঠে, আর এটাতো প্রায় আঠার বিশ ঘন্টার মামলা। কোনভাবেই সে যাবে না। আমার ইউএসএ যেতে না চাওয়ার আরেকটা কারণ আছে। আমার যা কপাল, হয়তো দেখা যাবে কোন না কোন ঝামেলায় পড়েছি।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১
ওয়ালথামে আমার ডেরা। মাঝখানের জানালা খোলা রুমটা ছিল আমার।

একটা ঘটনা বলি। ২০১০ সালে প্রথমবার দার্জিলিং যাচ্ছি, যার গল্পটা অন্য একটা লেখায় করেছি। বহ্নি ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেল। আমি পার হতে গিয়ে পড়লাম বিপদে। ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্ট গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন। সেই দেখা আর শেষ হয় না। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি ২০০৭-এ ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন বেনাপোল দিয়ে? ২০০৭ সালে আমরা দু’জন প্রথম বিদেশ যাত্রা করি। সেবার দার্জিলিং না, বেড়াতে গিয়েছিলাম আগ্রা, জয়পুরসহ আরো কিছু জায়গায়। সেই গল্প অন্য কোন এক সময় করা যাবে। দেখলাম অফিসারের ভুরু কুঁচকে আছে। লক্ষণ ভাল বোধ হল না। গলায় মধু ঢেলে বললাম, জ্বি স্যার, গিয়েছিলাম, সাথে আমার ওয়াইফও ছিল, ঐ যে দাঁড়িয়ে আছে সে। এইসব ক্ষেত্রে সাধারণত বিগলিত গলায় স্যার সম্বোধনে কাজ হয়। আমার ক্ষেত্রে হল না। তিনি পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে আমাকে অন্য একজনের কাছে পাঠালেন। বহ্নিও গেল আমার সাথে। সেই ভদ্রলোক আমার পাসপোর্ট দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ২০০৭-এ আপনি বেনাপোল দিয়ে ইন্ডিয়া গেছেন। কিন্তু ফেরত এসেছিলেন কোন্‌ পোর্ট দিয়ে? আপনার পাসপোর্টে তো ফেরত আসার কোন রেকর্ড নেই, অ্যারাইভাল সিল নেই।

এরকম সময় আকাশ থেকে পড়াই নিয়ম। আমি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস ষ্টেশন থেকে পড়লাম। আমরা তো বেনাপোল দিয়েই ফিরে এসেছিলাম। পাসপোর্টে রেকর্ড থাকবে না কেন? ভীত গলায় বললাম, ফেরত এসেছিলাম স্যার, এই যে আমি তো আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। তিনি অন্য দিকে তাকিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে বললেন, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু কিভাবে এসেছেন সেটা বলেন। কোন ইলিগ্যাল ওয়েতে ব্যাক করেছিলেন কি না আমাকে বলেন সেটা। বলেই এমন একটা লুক দিলেন আমার দিকে যেন আমি চোরাকারবারি বা ঐ জাতীয় কিছু একটা। কী যে বলব কিছুই বুঝতে পারছি না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পৌনে পাঁচটা বাজে। আমাদের ইন্ডিয়া যাবার প্লেন হচ্ছে জেট এয়ারওয়েজ। মনিটরে দেখলাম জেট এয়ারওয়েজের বোর্ডিং শুরু হচ্ছে। যাত্রীরা লাইন ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে এ কী বিপদে পড়লাম আমরা! হঠাৎ বহ্নি সেই অফিসারকে বলল, আমাকে পাসপোর্টটা একটু দেবেন প্লিজ? পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টে একটা পেজ বের করে অফিসারকে সে বলল, এই যে দেখেন ফেরত আসার সিল, বেনাপোল থেকেই দেয়া। দেখেন ওরা নতুন পাসপোর্টে সিল না দিয়ে পুরোনোটায় সিল দিয়েছে।

অফিসারের কান চুলকানো থেমে গেল। আমি আর অফিসার সাহেব দু’জনই কাকের মত হা করে পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ঘটনা হল আমার পুরনো আর নতুন পাসপোর্ট সবসময় একসাথে স্টেপল করা থাকে। যেকোন ইমিগ্রেশন অফিসার নতুন পাসপোর্টেই পুরনো ডিপার্চার আর অ্যারাইভালের সিল খুঁজবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ২০০৭ সালে সম্ভবত তাড়াহুড়োর কারণে আমার ইন্ডিয়া থেকে ফেরত আসার সিলটা নতুন পাসপোর্টে পড়েনি। পড়েছে স্টেপল করা পুরনোটার একটা পাতায়। অফিসার বহ্নির হাত থেকে পাসপোর্ট নিয়ে সিলটা দেখলেন, তারপর আমাদের ছেড়ে দিলেন। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাচলাম। ইমিগ্রেশনের দিকে যেতে যেতে বহ্নিকে বললাম, এটা তোমার মনে ছিল যে আমার পুরোনো পাসপোর্টেই অ্যারাইভাল সিল দিয়েছিল? বহ্নি হাসতে হাসতে বলল, না, সেটা মনে নেই। সিল দিয়েছিল এটা মনে আছে। তাই মনে হল যে পুরোনো পাসপোর্টটা একবার চেক করি। দেখলে তো, চেক করতেই বেরিয়ে গেল। বলেই সে হাসতে থাকল। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পাঠক কি ধরতে পারছেন কেন আমি একা ট্রাভেল করি না? বেড়াতে গিয়ে এরকম বহুবার আমি অদ্ভুত অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছি। বহ্নি আমাকে উদ্ধার করেছে। আমার একা ট্রাভেলভীতির এটাও একটা কারণ। কিন্তু অফিসকে তো এসব কথা বলা যায় না।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১
তুষারে মোড়া ওয়ালথামে আমার বাসার জানালার নেটের ফাঁকে সূর্যোদয়

যাই হোক, বহ্নি সব শুনে বলল তুমি অবশ্যই যাবে। আব্বার ওষুধ কেনা, আরো যা যা হাবিজাবি কাজ তুমি কর সেগুলো নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমিই করতে পারব। ও যে পারবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাও মন থেকে খচখচানি যাচ্ছে না। তবে ভরসা একটাই। ভিসা ফেস করার বিষয় আছে। মনের মধ্যে একটা আশা আছে যে আমাকে ভিসা দেবে না। তাহলে আর যাওয়া লাগে না।

এর আগে কখনো ইউএস ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করিনি। দেখলাম খুব কঠিন কিছু না। আমাকে নিতে হবে বিজনেস ভিসা। অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম ফিলআপ করে ইস্টার্ন ব্যাংকে ফী জমা দিলাম। নির্দিষ্ট দিনে ভিসার ডেটও পেয়ে গেলাম। তারপর সেই ডেটে সকালে ইউএস অ্যাম্বেসিতে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। একেকজন দিস্তা দিস্তা কাগজপত্র সাথে নিয়ে এসেছে। শুধু ভিসা নিতে আসা লোকজনই না, অনেকের সাথে তাদের রিলেটিভরাও এসেছে। এক্সপার্ট রিলেটিভরা লাইনের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিসাপ্রার্থীকে শিখিয়ে দিচ্ছে কোন্‌ প্রশ্নের কী জবাব দিতে হবে। পাখি পড়ানোর মত করে পড়া ধরছে আবার। একেকজনের অবস্থা এমন যেন জীবনের শেষ পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, তাই প্রিপারেশন নিচ্ছে ভাল মত।  রীতিমত কোচিং সেন্টার কোচিং সেন্টার আবহাওয়া চারপাশে। এদিকে আমি এসেছি একা এবং আমার কোন প্রিপারেশনই নেই। ভিসা অফিসার কিছু বললে হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে। একজনকে দেখলাম পলিথিনের একটা ছোটখাট বস্তা এনেছে। বস্তার ভেতর বিভিন্ন ধরণের কাগজপত্র, এমনকি জমির দলিল এনেছে বলেও মনে হল। মানুষজনের কথাবার্তায় জানলাম ব্যাংক স্টেটমেন্ট আনতে হয়, আরো অনেক কিছুই আনতে হয় তা না হলে নাকি ভিসা দেয় না। আমার কাছে এসব কিছুই নেই। হাতে আছে দুইটা মাত্র কাগজ। একটা আমার নিজের অফিস থেকে দেয়া, আরেকটা হচ্ছে ওয়ালথাম অফিস থেকে ইস্যু করা লেটার। মনে হল আমার দলিল-দস্তাবেজের রুগ্ন দশা দেখেই বোধহয় লাইনের কয়েকজন দুই দিকে মাথা নাড়ল। সম্ভবত তারা আমাকে নিয়ে হতাশ। বেশিরভাগ লোকজনকে দেখলাম স্যুট টাই পরে এসেছে। চকচকে জুতা পরে এসেছে। আমার পরনে শার্ট আর জিন্স, পায়ে কেডস্‌। নিজেকে এদের পাশে খুবই বেমানান লাগছে।

ভেতরে ঢোকার পর বসতে হল। ভেতরটা খুব সুন্দর করে গোছানো। একজন একজন করে নাম ধরে ডাকছে। আমার ডাক আসার পর কাউন্টারের সামনে গেলাম। কাঁচের অন্যপাশ থেকে হাসিখুশি এক ভিসা অফিসার আমার প্রোফেশন জানতে চাইল। কেন যেতে চাই জানতে চাইল। বললাম, দেখ, যাবার দরকার আমার দিক থেকে কম, আমাদের ক্লায়েন্ট চাইছে আমি যাই সেজন্য অ্যাপ্লাই করেছি। সত্যি কথাই বললাম, আর কী বলব? সে তার কম্পিউটার মনিটরে অন্যমনষ্কভাবে কি যেন দেখতে থাকল। এদিকে আমার পাশের কাউন্টারে সেই বস্তাওয়ালা তার পুরো বস্তার কাগজ ঠেসে কাঁচের নীচ দিয়ে ঢোকানোর চেষ্টা করছিল। কাগজের বান্ডিল কাঠের কাউন্টার আর গ্লাসের মাঝখানে আটকে গেছে। এখন মোটা কাগজের স্তুপটা সে টেনে বেরও করতে পারছে না, ঢোকাতেও পারছে না। তার ভিসা অফিসারকে দেখলাম হতাশ গলায় কাকে যেন ডাকছে। সম্ভবত সাহায্য চাইছে। পুরো ওয়েটিং রুমের লোকজন চোখ বড় বড় করে এই দৃশ্য দেখছে। বস্তাওয়ালা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর বারবার সরি বলছে। বেকায়দা কারবার আর কাকে বলে। মিঃ হোসেইন, কুড ইউ প্লিজ শো মি এনি ডকুমেন্ট দ্যাট সোজ ইউ ওয়ার্ক ফর দ্য ক্লায়েন্ট ইউ মেনশনড্‌?

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১
ওয়ালথামে মুডি স্ট্রিট ধরে হেঁটে গেলে চার্লস রিভারের রেলিং

আমিও অন্যমনষ্ক ছিলাম। হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে হা করে তাকালাম ভিসা অফিসারের দিকে। সে প্রশ্নটা রিপিট করল। ডকুমেন্টটা দিলাম। সাথে বললাম, আরেকটা কাগজ আছে দেখতে পার যদি চাও। সে বলল প্রয়োজন নেই। ডকুমেন্ট দেখতে দেখতে সে আমার পাসপোর্ট চাইল। আমি নিশ্চিত হলাম যে আমি রিজেক্টেড হতে যাচ্ছি। পাসপোর্টে আমার সিরিয়াল কিলার মার্কা ছবিটা দেখলে যেকোন ভিসা অফিসার ভিসা দেয়ার আগে দুইবার ভাববে। দেখলাম সে কিছু লিফলেট গোছাচ্ছে। যারা ভিসা পায় না তাদের হাতে এগুলো ধরিয়ে দেয়া হয় যেখানে বিতং করে লেখা থাকে কেন ভিসা দেয়া হয় নি। ভিসা রিজেক্টেড হবার পর একটা ছেলে আমার পাশে বসে এরকম একটা লিফলেট পড়ছিল। পাশে বসে থাকায় কিছু লেখা তখন চোখে পড়েছিল। একটু শান্তি লাগল যে আমাকে ইউএসএ যেতে হচ্ছে না। পাসপোর্ট দেখতে দেখতে ভিসা অফিসার হাসিমুখে হঠাৎ আমাকে ডাকল, মিঃ হোসেইন। আমিও হাসিমুখে বললাম, ইয়েস ম্যাম। সে বলল, তোমার পাসপোর্ট আমরা রাখছি। আশা করছি এক সপ্তাহের মধ্যে তোমার ভিসা হয়ে যাবে। বাই দ্য ওয়ে, তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে এখন অনেক ঠান্ডা, যাবার সময় একটা গরম জ্যাকেট সাথে নিয়ে যেও। বলেই আমাকে যে কাগজটা সে ধরিয়ে দিল, সেটা অন্য একটা কাগজ। সেখানে লেখা আছে কোথা থেকে আমার পাসপোর্ট কালেক্ট করতে হবে। আমি কাগজটা নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে থাকলাম।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ১
ওয়ালথাম ফায়ার ডিপার্ট্মেন্টের বিল্ডিং

তিনদিনের মধ্যে ভিসা হয়ে গেল। পাসপোর্ট কালেক্ট করে দেখলাম আমি অ্যাপ্লাই করেছিলাম এক মাসের বিজনেস ভিসা, আমাকে দিয়েছে পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি বিজনেস এবং ট্যুরিস্ট ভিসা। কি মনে করে এই ভিসা তারা দিয়েছে আমি জানি না। বাসায় এসে বহ্নিকে খবরটা দিলাম। সে খুব খুশী। আমি চাইছিলাম বহ্নিও ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য অ্যাপ্লাই করুক। দু’জন মিলেই না হয় ঘুরে আসি। কিন্তু যা ভেবেছিলাম, তাকে কোনভাবেই রাজি করাতে পারলাম না। মন খারাপ করে বসে আছি। ফেব্রুয়ারির এক তারিখে আমার যাওয়া। আজকে হচ্ছে জানুয়ারির পনের। প্লেনের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। টার্কিশ এয়ারলাইন্সে ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুল, ইস্তাম্বুল থেকে বোস্টন। এই বিশাল জার্নিটা আমি করব একা। তার উপর এক মাস একা একা থাকতে হবে। ভাবতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রাতে শারমিন ফোন দিল। ভিসা পাবার খবরটা তাকে মেইল করেছিলাম। সে বলল, শোনেন জাকির, একটা ব্যাপার হয়েছে। আপনাকে একটু বেশি সময়ের জন্য থাকতে হতে পারে। আমি হতভম্ব। বেশি সময়ের জন্য মানে? সে বলল, মানে একটু বেশি আর কি, ধরেন মাস ছয়েক। যদিও এখনো আমি শিওর না, কিছুটা কমও হতে পারে। বহ্নি পাশে দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছিল। শারমিন ওদিকে ফোনে বলে চলেছে, ওরা চাচ্ছে নতুন প্রোজেক্টের কিক-অফটা অনশোর থেকেই করেন। আমি আপনাকে ই-মেইলে ডিটেইল জানাব, ঠিক আছে? শারমিন ফোন কেটে দিল। বহ্নি তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সে সবই বুঝতে পারছে। অতলান্তিক শব্দের মানে হচ্ছে অন্তহীন যার তল। সংস্কৃত শব্দ। আটলান্টিক শব্দটা সেখান থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা হয়। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমার আমেরিকায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু আটলান্টিক পাড়ি দেবার আগেই এ-কী অতলান্তিক ঝামেলায় পড়লাম! এখন কী করব?

(চলবে)

সারাবাংলা/এসএসএস





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: