‘ঘোষণা ও প্রয়োজনের সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেট অসঙ্গতিপূর্ণ’


স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য দিয়ে ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনের ও জীবিকার প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার (৩ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন।

বাজেট প্রতিক্রিয়ার বিবৃতিতে বলেন, গত বাজেটের চেয়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই বাজেট করোনাকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান রক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তার চেয়ে বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে তিনি আশঙ্কা করছেন খালেকুজ্জামান।

তিনি বলেন, খাদ্য সরবরাহ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, শ্রমিক কৃষক, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জীবন বাঁচাতে রেশন ব্যবস্থা চালু, শ্রমজীবীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। যে কৃষি ও কৃষক ধান, ভুট্টা, মাছ, মাংস, সবজি, ফল উৎপাদন করে করোনাকালে দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ৪২ শতাংশ শ্রমজীবীর কর্মসংস্থান করেছে, সেখানে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো দরকার ছিল। কিন্তু বাজেটে গত তিন বছর ধরে কৃষি খাতে ভর্তুকি একই পরিমাণ রাখা হয়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় কৃষিতে ভর্তুকি কমে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম উল্লেখ করে খালেকুজ্জামান বলেন, করোনায় আগের তুলনায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। দরিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ৪২ শতাংশের বেশি হয়েছে। অথচ তাদের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১৪ লাখ, আর বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়াতে ১৫০০ কোটি টাকা এবং পেনশনভোগীদের জন্য টাকার বাড়তি বরাদ্দ বাদ দিলে বাস্তবে তেমন কোনো বরাদ্দই বাড়েনি। উল্টো রাজস্ব আয় বাড়াতে গিয়ে জনগণের ওপর বাড়তি ভ্যাটের বোঝা চাপালেও করপোরেট ট্যাক্স ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে সরকার তার ধনিক তোষণের নীতিকে অব্যাহত রেখেছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে দেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি উল্লেখ করে খালেকুজ্জামান বলেন, কিন্তু বাজেট ওই খাতে বরাদ্দে প্রান্তিক পর্যায়ে। গত বাজেটে করোনাকালে প্রণোদনায় কৃষি ঋণের সুদ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অথচ গার্মেন্টসসহ শিল্পে তা ২ শতাংশ করা হয়েছিল। কৃষি ঋণের সুদ কমানোর প্রস্তাব এবারের বাজেটেও নেই। আবার করোনায় কাজ হারিয়েছে শ্রমিক, ৬ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছে। প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসে ২২ লাখ তরুণ। তাদের কর্মসংস্থানের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা এবারের বাজেট প্রস্তাবে নেই।

তিনি বলেন, সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী এবং ২০ লাখের বেশি শিক্ষক করোনাকালে বিপর্যস্ত। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা সহায়তা এবং শিক্ষকদের জন্য দুর্যোগ ভাতা প্রয়োজন থাকলেও বাজেটে তার নির্দেশনা নেই। নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও পাহাড়-সমতলের আদিবাসী মানুষেরা করোনায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপদাপন্ন হয়েছেন। তাদেরকে রক্ষায় কোনো বরাদ্দ ও নির্দেশনা বাজেট প্রস্তাবে নেই। এক্ষেত্রে গতানুগতিকভাবে দায়সারা গোছের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কালো টাকা বৈধ করার ধারাবাহিক ভূমিকার সমালোচনা করে বাসদ সাধারণ সম্পাদক বলেন, এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যে কালো টাকা উৎপাদনের ব্যবস্থা বহাল আছে এবং সরকার কালো টাকার উৎপাদন বহাল রাখতে চায়। একদিকে বাজেটে জনগণের ওপর কর ভ্যাট বাড়ানো, অন্যদিকে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া লুটপাটের টাকার আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার নিন্দা জানিয়ে কালো টাকা বাজেয়াপ্ত এবং তা উদ্ধার করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্পখাতে বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।

‘বিশাল বাজেটের বড় বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমলা সহায়ক এই বাজেট কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, শ্রমিককে দুর্দশায় ফেলবে, বেকারদেরকে হতাশায় নিমজ্জিত করবে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে ফেলবে,’— বলেন খালেকুজ্জামান। তিনি এই বাজেটকে ধনী, শিল্পপতি ও বড়লোকবান্ধব উল্লেখ করে শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনগণের স্বার্থে বাজেট সংশোধনের দাবি জানান।

সারাবাংলা/এএইচএইচ/টিআর





Source link