‘ব্যবসায়ীদের খুশি করলেও বাজেট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে হতাশ করেছে’


স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘জীবন ও জীবিকা’ রক্ষার বাজেট প্রণয়নের যে অঙ্গীকার সরকার দিয়েছিল, সংসদে উত্থাপিত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টর সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধনে ১২ দফা দাবিও তুলে ধরেছেন তিনি।

সাইফুল হক বলেন, ২০২১ আগামী অর্থবছরের জন্য যে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, তা বিত্তবান, সম্পদশালী ও ব্যবসায়ীদেরকে খুশি করলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। করোনা মহামারি দুর্যোগ মোকাবি ও তা থেকে উত্তরণে অর্থমন্ত্রীসহ সরকার ‘জীবন-জীবিকা’ রক্ষার যে বাজেট দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, সেই অঙ্গীকার তারা রাখেননি। এটি দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতারণার সামিল।

সোমবার (৭ জুন) ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, সাইফুল ইসলাম, মহানগর কমিটির আবুল কালাম, ছাত্র সংহতির নেতা রফিকুল ইসলম অভি, তিথি সুবর্ণাসহ অন্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে সাইফুল হক বলেন, এটি স্পষ্ট যে মহামারি-দুর্যোগ মোকাবিলার বাজেট এটি নয়। দুর্যোগ উত্তরণের বাজেট তো নয়ই। এই বাজেট দিয়ে কোনোভাবেই করোনা দুর্যোগজনিত বহুমাত্রিক নেতিবাচক অভিঘাত মোকাবিলা করা যাবে না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই ঐতিহাসিক বছরেও বাজেট সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেনি, বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপরীতেই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বাধীনতার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা ছয় কোটি মানুষ এবং করোনা দুর্যোগের নানা অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের জন্য ছিটেফোঁটা দান-খয়রাত আর দয়া দাক্ষিণ্য ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছু নেই। উল্টো এই বাজেটের মধ্য দিয়ে সম্পদশালীরা আরও সম্পদশালী হবে। আর এ বছরের মধ্যেই আরও ৫০ লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে।

তিনি বলেন, করোনা দুর্যোগজনিত পরিস্থিতিতে যেসব খাত এবং নিম্ন আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাজেটের অগ্রাধিকারে থাকার কথা ছিল, তা হয়নি। স্বাস্থ্য-চিকিৎসা খাত গুরুত্ব পায়নি, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও মনোযোগ অপ্রতুল। উল্টো শিক্ষার ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব পাটকল, চিনিকল, সুতাকলসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় শিল্পের অবস্থা শোচনীয়। বাজেটে এসব শিল্পের পুনরুজ্জীবনের কোনো নির্দেশনা নেই। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কার্যত সরকারের নগদ সাহায্য ও প্রণোদনার বাইরে। কর্মসংস্থানের কার্যকরি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেই। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের তুলনায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খুবই সীমিত। নিঃস্ব ও অতিদরিদ্রদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থাসহ খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো ব্যবস্থা নেই।

সংবাদ সম্মেলনে সাাইফুল হক বলেন, দুর্যোগকালীন সরকার পরিচালনার ব্যয় যখন কমানো দরকার ছিল, তখন এই ব্যয় আরও বাড়ানো হয়েছে। সামরিক খাতসহ অনুৎপাদনশীর খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাহীন মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের উৎপাদন যখন উদ্বৃত্ত, তখন রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের যুক্তি কোথায়?

গত অর্থবছরের বাজেট কেন বাস্তবায়ন করা গেল না— বাজেটে তার কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা না থাকার সমালোচনা করেছেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক শক্তি না থাকায় নিজেদের ঘোষিত বাজেটও বাস্তবায়ন করতে পারছে না। আর বাজেট নিয়ে যে হৈচৈ, তা জুন মাস পর্যন্তই। এরপর বাজেট সংক্রান্ত আলোচনা আর তাপ-উত্তাপ হিমাগারে চলে যায়। ত্রৈমাসিক বা ষান্মাষিক পর্যায়ে বাজেট বাস্তবায়নের কোনো পর্যালোচনা নেই।

এই অবস্থায় প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখান করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে ১২ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন সাইফুল হক। এই ১২ দফা প্রস্তাব্না অনুযায়ী বাজেটকে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। এই ১২ দফা হলো—

১. করোনা মহামারি ও মহামারিজনিত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, খাদ্য-কর্মসংস্থান এবং কৃষি ও গ্রামীণ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে;

২. জনগণের স্বাস্থ্যকে সম্পদ বিবেচনা করে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘গণস্বাস্থ্য’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয়ভার রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। ১৮ বছরের বেশি সব মানুষকে এ বছরের মধ্যে করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে এবং দ্রুত ভ্যাকসিন আমদানির পাশাপাশি দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের সমন্বিত কার্যক্রম নিতে হবে;

৩. কৃষি ও গ্রামীণ খাতের পুনরুজ্জীবন ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করতে উন্নয়ন বাজেটের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টন ধান কিনতে হবে। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র প্রকল্প, মৎস্য, দুগ্ধ ও পোল্ট্রির মতো উৎপাদনশীল উদ্যোগকে আর্থিক প্রণোদনা ও সাহায্য নিশ্চিত করতে হবে;

৪ ‘তেল মাথায় তেল’ দেওয়ার নীতি পরিহার করে মাঝারি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক শিল্প উদ্যোক্তাদের পরিকল্পিতভাবে প্রণোদনা দিতে হবে। পাদুকা শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতগুলোকে কার্যকর সহযোগিতা দিতে হবে;

৫. জাতীয় শিল্প রক্ষায় বন্ধ পাটকল-চিনিকল চালু করতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে;

৬. দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসা দেশের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী-মেহনতি-দিনমজুর ও দরিদ্র আড়াই কোটি পরিবারের জন্য আগামী ৬ মাস প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নগদ অর্থ দিতে বরাদ্দ থাকা দরকার। শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্থায়ী গণবণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাজেটে পরিষ্কার নির্দেশনা ও বরাদ্দ রাখতে হবে;

৭. রাজস্ব ব্যয় তথা সরকার পরিচালনার খরচ কমাতে হবে। বিলাস দ্রব্যের আমদানি ও রাষ্ট্রীয় অপচয় বন্ধ করতে হবে। সামরিক খাতসহ অনুৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ কমিয়ে আনা প্রয়োজন;

৮. কালো টাকা সাদা করার কৌশলী নীতি বাতিল করে কালো টাকা, অপ্রদর্শিত অর্থ-সম্পদ ও বিদেশে পাচার করা উদ্ধার করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সব ধনী ও বিত্তবানদের করের আওতায় নিয়ে এসে তাদের ওপর বর্ধিত কর আরোপ করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে;

৯. মেগা প্রকল্পে জবাবদিহিতাবিহীন ব্যয় বাড়ানোর বর্তমান ধারা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে;

১০ পরিবহন ভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বাড়ি ভাড়া ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের নীতি নিতে হবে। সব স্তরে মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে;

১১. উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে। শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দিতে হবে; এবং

১২. দেশের বিপর্যস্ত দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সারাবাংলা/এএইচএইচ/টিআর





Source link