latest

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬


জাকির হোসেন

আপনারা যারা আমার এই অতলান্তিক পেরিয়ে পড়ছেন গত পাঁচ পর্ব ধরে, আপনাদেরকে ধন্যবাদ। আজকের ছয় নাম্বার পর্বটা হবে বাস জার্নি নিয়ে। বাস জার্নি বলতে সাধারণত যা বোঝায় যে এক জায়গা থেকে বহুদূরের আরেক কোন জায়গায় যাওয়া, সেরকম না। ওয়ালথাম শহরের ভেতরেই, কিংবা ওয়ালথাম থেকে আরেক শহরে যাবার জন্য আমাকে যে বাসে চড়তে হত সেই বাসেই মাঝে মাঝেই ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটনা ঘটত। ভাবলাম ঘটনাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করা যায়। চলেন তাহলে শুরু করা যাক।

আমেরিকায় অফিসে যাবার জন্য আমার ভরসা ছিল বাস। MBTA হচ্ছে ম্যাসাচুসেট্‌স-এর স্টেট বাস। সারাদিন ধরে বোস্টন ডাউনটাউন থেকে আলাদা আলাদা নাম্বার-ওয়ালা বাস নানান জায়গায় ঘুরপাক খায়। ওয়ালথাম কিংবা নিউটন (আরেকটা শহরের নাম) থেকে রবার্টস হয়ে আমার অফিস যাবার জন্য আমি ধরতাম ৫৫৩ নাম্বার বাস। কেমব্রিজ কিংবা ওয়াটারটাউন যেতে মন চাইলে ধরতাম ৭০ নাম্বার। সারা মাসের জন্য আমার চার্লি কার্ড করা আছে। যতবার ইচ্ছা চড়ব, আলাদা কোন পয়সা খরচ হবে না। বাস ছাড়া এখানে ট্রেনও আছে MBTA-এর। আমার বাসা থেকে অফিস যাবার পথে তিনটা ট্রেন লাইন পড়ত। গমগম শব্দ করে ট্রেনগুলো যখন যেত, আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। ট্রেন আমার কাছে অত্যন্ত রোমান্টিক একটা বাহন। কে জানে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা, কিংবা পথের পাঁচালী এর জন্য দায়ী কি না। চোখের আড়ালে চলে না যাওয়া পর্যন্ত ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকা, আর আকাশে শব্দ করে প্লেন উড়ে গেলে ঘাড় কাত করে তাকানোর অভ্যাস এই বুড়ো বয়সেও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবে এখানে বাসগুলোর একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি। সেটা হল, কোন বাস যখনই কোন ট্রেন-ট্র্যাকের উপর দিয়ে যায়, চট করে সেটা একবার থামে। এমনকি যদি তখন কোন ট্রেন আসার সিগনাল না-ও থাকে, তারপরেও থামে। এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম দেখিনি, বাস এখানে এলে থামবেই। তারচেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হল থামা অবস্থায় সামনের দরজাটা ড্রাইভার একবার খোলে তারপর আবার বন্ধ করে। তারপর চলা শুরু করে। অসংখ্যবার এই জিনিসটা দেখেছি। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞেসও করেছি যে বাস ড্রাইভাররা এই কাজটা কেন করে। কেউ কোন জবাব দিতে পারেনি। অবশ্য আমেরিকানদের কোন প্রশ্ন করা আর কলাগাছকে প্রশ্ন করা একই কথা।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
এই সেই টার্নার স্ট্রিটের বাসস্ট্যান্ড যেখানে নামতাম অফিসের জন্য।

এরা সারা সপ্তাহ মুখিয়ে থাকে কবে শুক্রবার আসবে, অফিস শেষ হবে। ফ্রাইডে নাইটে কখন ‘ফান’ করবে। যেই জিনিস না জানলে তাদের ফান এ কোন ঘাটতি হবে না, সেটা তারা জানার চেষ্টাও করবে না কোনদিন। যাই হোক, বিষয়টা জানার জন্য শেষ পর্যন্ত গুগোলের সাহায্য নিলাম। ব্যাপারটা এতটাই সিলি যে ঠিক কী লিখে সার্চ যে দেব সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। আর সার্চ দিলেও যে কিছু পাব সেরকম মনেও হচ্ছিল না। আশ্চর্যের বিষয়, আমি ব্যাপারটা খুঁজে পেলাম। গুগল আমাকে জানাল ঘটনাটা কি।

১৯৩৮ সালে ইউটাহ (Utah) এর সল্ট লেক সিটিতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। দিনটা ছিল ডিসেম্বরের ১ তারিখ। সেদিন সকালে উনচল্লিশ জন বাচ্চাকে নিয়ে একটা স্কুল বাস যাচ্ছিল তাদের স্কুলে। সকাল থেকেই আবহাওয়া ছিল খারাপ। তার উপর বলা নেই কওয়া নেই আচমকা শুরু হয়ে গেল তুষার ঝড়। ছোট ছোট বাচ্চাভর্তি বাস সহ ড্রাইভার পড়ল ঝড়ের কবলে। এমনই ঝড় যে আশে পাশে সে কিছুই দেখতে পারছে না। স্কুলে যাবার পথে একটা রেল-ক্রসিং পড়ে। যেহেতু সে লোকাল ড্রাইভার, তার সব ট্রেনের টাইমিংই মুখস্থ। সে জানে যে ভোরে একটা মালগাড়ি যাবার কথা। সেটা চলে গেছে ঘন্টা দু’এক আগে। ড্রাইভার রেল ক্রসিং এর উপর বাস উঠিয়ে দিল। তারপরেই ঘটল আমেরিকার ইতিহাসে এক ভয়াবহ বাস দূর্ঘটনা। সেই মালগাড়িটা, যার দুই ঘন্টা আগেই সেখান দিয়ে চলে যাবার কথা, ঝড়ের কারণে সেটা লেট করেছিল। আর বাসটা যখন রেল ক্রসিং-এ ওঠে, ঠিক তখনই ট্রেনটা সেখান দিয়ে ক্রস করে। ড্রাইভার সহ চব্বিশ জন ছোট্ট শিশু সেখানেই নিহত হয়। প্রবল ঝড়ের কারণে ট্রেন এবং বাস কেউ কাউকে দেখতে পায়নি। লাইনটা ক্রস করার আগে ড্রাইভার যদি একটু দাঁড়াত, আর দাঁড়িয়ে যদি দরজাটা খুলত, তাহলে কিছু দেখতে না পেলেও হয়ত ট্রেনের হুইসেলটা সে শুনতে পেত। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাটা থেকে জন্ম হয় একটা আইনের। আইনে বলা হল, কোন বাস যখনই কোন রেললাইন ক্রস করবে, বাধ্যতামূলক ভাবে ট্রেন-ট্র্যাকের উপর একবার দাঁড়িয়ে সামনের দরজাটা খুলে আবার বন্ধ করবে। সেই ভয়ংকর ঘটনার পর ১৯৯৫, ১৯৯৭ এবং ২০০২ সালে সল্ট লেক সিটির সেই একই রেলক্রসিং-এ আবারো দূর্ঘটনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত সেই অভিশপ্ত রেল ক্রসিংটা বন্ধ করে দেয়া হয়। ঘটনাটা জানার কৌতূহল ছিল, কিন্তু সেটা যে এতটা মর্মস্পর্শী, তা জানতাম না। মন খারাপ করে অফিসে গেলাম সেদিন।

অফিস যাবার পথে প্রায়ই এমন হত যে বাসে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। যাবার পথে শেক্সপিয়ার রোড বলে একটা রোড পড়ত। বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার এখানেই নেমে যেত। ব্র্যান্ডাইজ ইউনিভার্সিটির অল্প বয়স্ক কিছু ছেলেমেয়ে উঠত মাঝে মাঝে, যারা আরো দুটো স্টপ পরে তাদের ভার্সিটিতে নামত। বাকি রাস্তাটা ফাঁকা বাসে নবাবের মত একা একা আকাশ বাতাস দেখতে দেখতে চলতাম, তারপর নামতাম গিয়ে টার্নার স্ট্রিটে, আমার অফিসের রাস্তায়। একদিন এর ব্যতিক্রম হল। কোন অজ্ঞাত কারণে সেদিন বাস ভর্তি ব্র্যান্ডাইজের ছাত্রছাত্রী। হতে পারে তারা সেদিন তাদের ভার্সিটির বাস মিস করেছিল। পৃথিবীর সব ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের চেহারা অবশ্যই এক রকম না। তবে তাদের কার্যকলাপ প্রায় একই রকম। সম্ভবত বয়সটাই এর জন্য দায়ী।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
বাস থেকে তোলা ব্র্যান্ডাইজ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস।

কারণে অকারণে খিলখিল করে হাসা এই বয়সের মেয়েদের অবশ্য কর্তব্যের একটা। আমেরিকান ইয়াং মেয়েরা কথার মাঝখানে “লাইক” আর “আই মিন” ছাড়া যে কোন বাক্য গঠন করতে পারেনা সেটা শিখেছি কিছুদিন হয়েছে। এখানকার এই বয়সী ছেলেগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জোরে জোরে কথা বলা আর সবকিছুতে একটা উন্নাসিক ভাব দেখানো। জোরে কথা বলাটা সম্ভবত ম্যাসকুলিনিটির পার্ট। যথারীতি সেটা তারা রিলিজিয়াসলি করে যাচ্ছে। বাসে বসে বসে ওদের কথাবার্তা শুনছি। শুধু শুনছি না, উপভোগও করছি। বোস্টন’স চিল্ড্রেন হসপিটালটা পার হবার পরে হঠাৎ করে বাসটা কেন জানি থেমে গেল। এই বাসগুলোতে প্রত্যেক সিটের পাশে একটা স্টপ বাটন থাকে। যেটা চাপলে ড্রাইভারের কাছে ম্যাসেজ যায় যে পরের স্টপেজে কেউ নামবে, বাস থামাতে হবে। কিন্তু কেউ স্টপ রিকুয়েস্ট করেনি। কেউ নামছেও না দেখলাম। তারপরেও কেন বাসটা থামল আমরা কেউ বুঝতে পারছিনা। ড্রাইভারকে দেখি সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় আর কোন গাড়িও নেই। কি হল কেউ বুঝতে পারছে না। বাসভর্তি ছেলেমেয়েগুলোও কথা থামিয়ে উশখুশ করছে। একটু পরে দেখি বয়স্ক একজন পুলিশ অফিসার বাসের সামনের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ড্রাইভার হাইড্রলিক দরজাটা খুলে দিল। শুনলাম পুলিশ অফিসার ড্রাইভারকে বলছে, ইজ এভরিথিং ওকে? ড্রাইভার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ সব ওকে। পুলিশ বলল তোমার গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে কেন? ড্রাইভার বলল তার বাসের সামনের ডান দিকের হেডলাইটটা কালকে থেকে ম্যালফাংশন করছে। কোন কারণ ছাড়াই সেটা জ্বলে থাকছে, নিভছে না। আজ ডিপোতে ফেরত গিয়ে সে এমবিটিএ-তে এটা রিপোর্ট করবে। পুলিশ হাসিমুখে বলল ওকে, স্যরি টু স্টপ ইউ।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
ফুল ফোটা শুরু হয়েছে।

এই বয়স্ক পুলিশ অফিসার দূর থেকে প্যাসেঞ্জার ভর্তি একটা বাসকে একদিকের হেডলাইট জ্বালিয়ে আসতে দেখেছিল। তার ট্রেনিং এবং অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে এটা তার চোখে অস্বাভাবিক ঠেকেছে। তার কাছে মনে হয়েছে এটা তার সন্দেহ করা উচিত কারণ এটা কোন ডিসট্রেস কল হতে পারে। হয়ত বাসটা হাইজ্যাকড্‌ হয়েছে। হয়ত ড্রাইভার একটামাত্র হেডলাইট জ্বালিয়ে সংকেত দেবার চেষ্টা করছে। সে একজন সাধারণ পেট্রল-পুলিশ এবং একা। তার থেকেও বড় কথা ওর যা বয়স তাতে মনে হয় প্রায় রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে গেছে তার। চাইলেই ব্যাপারটা সে ইগনোর করতে পারত। কিন্তু সে তার কর্তব্যে বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে এবং কোন রকম দ্বিধা না করে বাসটাকে থামাল। আজকে যদি সত্যিই এখানে হাইজ্যাকার থাকত, এই বয়স্ক পুলিশটির প্রাণ সংশয় হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। আমেরিকান হাইজ্যাকাররা ফার্স্ট চান্স পাওয়া মাত্র পুলিশকে গুলি করে দেয়। বাসে কোন ঝামেলা হয়নি জেনে পুলিশ বাসটাকে ছেড়ে দিল। বাসটা চলা শুরু করল আবার। আমরা সবাই হাঁফ ছাড়লাম। হাসি ঠাট্টা হৈ-চৈ তে পিকনিক পিকনিক ভাব আবার প্রবল হয়ে উঠল। আমি চুপচাপ বসে ভাবতে লাগলাম আমার নিজের দেশের পুলিশিং সিস্টেমের কথা। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
বোস্টনে একদিন বেড়াতে যাবার সময়।

হাই স্ট্রিটের বাসস্ট্যান্ডে আমার অফিস রুটের বাসটা আসত সকাল সাতটায়। অন্তত তা-ই আসার কথা। তবে এটা প্রায় কখনোই সময় মত আসত না। এ সময়টায় বেঞ্চে বসে থেকে ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত দু’টোকে নিয়ে আমি কি করব ভেবে পেতাম না। ওয়ালথামে আসার কিছুদিনের মধ্যেই আমি আমার ডান হাতের গ্লাভস্‌টা হারিয়ে ফেলি, যেটা আগের কোন এক পর্বে লিখেছি। শুধু বাম হাতে গ্লাভস্‌ পরার কোন মানে হয়না দেখে গ্লাভস্‌ পরাই বাদ দিয়ে দিলাম। ব্যাপারটা খুবই বোকামি ছিল। জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে না রাখলে কব্জির উপরে হাতের যে আরো কিছু অংশ আছে সেটা আমি মাঝে মাঝেই অনুভব করতে পারতাম না। এখন বললে অনেকেরই হয়তো বিশ্বাস হবে না যে ওয়ালথামের কোন দোকানেই সে সময় গ্লাভস্‌ পাওয়া যাচ্ছিলনা। এর কারণ এত বেশি ঠান্ডা আর তুষারপাত সেবার হয়েছিল যে এমনকি স্থানীয়রাই বলছিল যে এটা একেবারে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। একবার বোস্টনের এক দোকানে মোটামুটি ভাল এক জোড়া গ্লাভস পাই আমার হাতের সাইজের। দাম ২৫ ডলার দেখে চুপ মেরে গেলাম। বাংলাদেশে যে জিনিস আমি ২০০ টাকায় পাব সেটা এখানে ২৫ ডলার দিয়ে কেনার কোন উৎসাহ বোধ করিনি। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মাঝে মাঝে আমি ফুটপাথের উপর লাফাতাম। মুখ বড় করে হা করতাম। আবার বন্ধ করতাম। এ সবই হল ঠান্ডা থেকে বাঁচার আমার নিজস্ব টেকনিক। আশেপাশের সবাই ব্যাপারটা দেখত, কেউ কিছু বলতনা। যত উদ্ভটই লাগুক, অন্যের কাজে নাক গলানো এদের ধাতের মধ্যে পড়েনা।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
এই কার্টুনের মত বাড়িটা আমার আসা যাওয়ার পথে পড়ত।

আর মাইনাস কুড়ি ডিগ্রি সেলসিয়াসে যে কেউ যা ইচ্ছা উদ্ভট কাজ করতে পারে, তাতে দোষের কিছু নেই। এক দিনের ঘটনা। ফুটপাথে আমার বিচিত্র কার্যকলাপের মাঝখানে হঠাৎ পেছন থেকে কে জানি বলে উঠল, আর ইয়ু গোয়িং টু ব্র্যান্ডাইস? তাকিয়ে দেখি বয়স্ক এক হোয়াইট মহিলা। সবুজ রঙের একটা সোয়েটার আর ঢোলা জিন্স পরা। মাথায় একটা উলের টুপি। ঠান্ডায় নাকের মাথা লাল হয়ে গেছে। আমি বললাম, নো। আমি টার্নার স্ট্রিট যাব। মহিলা বলল আই হেইট দিস বাস। আই হেইট দিস বাস ড্রাইভার। আই হেইট দিস ওয়েদার। বাই দ্য ওয়ে, তোমার হাতে গ্লাভস্‌ নেই কেন? কি আর বলব, একটা ফ্যাকাশে হাসি দিলাম। সে হাত বাড়িয়ে বলল, ইয়ু সিম নিউ টু দিস এরিয়া, আই অ্যাম রনি। এভাবেই রনির সাথে আমার পরিচয়।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
বরফ গলে যাবার পর হাঁসেরা ভ্রমণে বের হয়েছে চার্লস রিভারে।

রনি হল একজন কেয়ার গিভার। তার নিজের বয়স সাতান্ন। সে বিরানব্বই বছরের এক বয়স্ক মহিলার যত্ন-আত্তি করে। বিনিময়ে মাস গেলে বেতন পায়। এই বেতনে কোন রকমে তার চলে যায়। তার কোন মোবাইল নেই। কোন ইন্টারনেট কানেকশন নেই। কোন ল্যান্ডফোন নেই। কোন কম্পিউটার নেই। ব্যাপারটা আপনাদের কাছে যদি অদ্ভুতও লাগে এটা সত্য। আমার নিজের কাছেও ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগত। সবার ধারণা হতে পারে আমেরিকানদের মত টেকনোলজির চূড়ান্ত সুবিধা যারা পায় তারা না জানি কত কিছু ব্যবহার করে। কিন্তু আমি প্রায়ই দেখেছি এখানে অনেকের কোন ই-মেইল অ্যাকাউন্ট নেই। কিংবা মোবাইল নেই।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
কেন যেন এই বাড়িটাও আমাকে মুগ্ধ করত। কে জানে নীল আমার পছন্দের রঙ বলেই কি না।

আমার অফিসেই লী বলে একজন আছে যার সাথে কথা বলতে হলে হেঁটে তার ডেস্কে যেত হত, কারণ সে স্কাইপ ব্যবহার করে না। রনির সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার কথা হত। তার জন্ম ইস্ট কোস্টেই। সে জীবনে কোনদিন আমেরিকার খুব বেশী দূর কোথাও যায়নি। শুধু সে যখন অনেক ছোট ছিল তখন নাকি সে ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিল। কথাটা বলার সময় কেন জানি তার মুখটা দুস্টুমিতে ভরে যেত। সম্ভবত ছেলেবেলার কথা মনে পড়ত তার। সবারই পড়ে। আমি কোথায় থাকি, আমার দেশটা কেমন, এসব নিয়ে তার কৌতূহল ছিল। আমিও রঙ চড়িয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমার নিজের শহরের গুনগান গাইতাম। বাস আসা পর্যন্ত আমাদের এইসব কনভার্সেশন চলত। আর বাসটা করত প্রতিদিনই লেট। রনি অস্থিরভাবে ফুটপাথে পায়চারি করত আর বলত, আই হেইট দিস বাস। আই হেইট দিস বাস ড্রাইভার। বাসের ড্রাইভার এক দিন আমাকে নামিয়ে দেবার সময় বলে, ওই বুড়ি তোমার কাছে আমার নামে কমপ্লেইন করে তাই না? আমি হাসলাম। সে বলে, বি কেয়ারফুল অ্যাবাউট দ্যাট লেডি, শি সামটাইমস্‌ গেট্‌স টু পারসোনাল। বলেই একটা মুচকি হাসি দেয় সে। রনি বাস ড্রাইভারকে দেখতে পারতনা সে লেট করে বলে, আবার বাস ড্রাইভারও বুঝতো যে বুড়ি তাকে নিয়ে আমার কাছে গজগজ করে।

আরেকদিনের কথা। সেদিন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। শীতকাল প্রায় শেষের পথে। বৃষ্টির মধ্যে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বাসের কোন খবর নেই। রনিও নেই। বাস এল প্রায় বিশ মিনিট লেট করে। কিছুদূর যাবার পরে জানালা দিয়ে দেখি রনি বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। সম্ভবত বাস না পেয়ে হেঁটেই কাজে যাবে বলে রওনা দিয়েছে। আমাদের বাসটা দেখে সে ফুটপাথ দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। আমি চিন্তিত। সে কি বাস ধরতে পারবে? তার চেয়েও বড় কথা তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে দৌড়াতে গিয়ে কোন অঘটন না ঘটিয়ে ফেলে আবার। বাসের সবাই রনিকে লক্ষ্য করছে, ড্রাইভারও তাকে দেখেছে। কিন্তু ড্রাইভার বাস থামাচ্ছে না। একটা বয়স্ক মানুষ বৃষ্টির মধ্যে বাসের জন্য দৌড়াচ্ছে আর সে বাস থামাচ্ছে না। মনে হল রনি যে ড্রাইভারকে সহ্য করতে পারে না সেটা এমনি এমনি না। একটু পরেই দেখি বাস-স্টপেজ এল একটা। ড্রাইভার সেখানে বাস থামিয়ে রিয়ার ভিউ মিররে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগল বুড়ি কত দূরে। দুই মিনিট পর হাঁপাতে হাঁপাতে রনি বাসে উঠল। ড্রাইভার মুচকি হাসি দিয়ে বাস ছেড়ে দিল। ড্রাইভার চাইলে বাসটা রাস্তার মাঝখানে থামাতে পারত। কিন্তু সেটা হত রুলসের বিরুদ্ধে। এখানে চাইলেই আমাদের দেশের মত রাস্তার মাঝখানে যেখানে ইচ্ছা সেখানে বাস থামানো যায় না। নেক্সট স্টপেজ না আসা পর্যন্ত চালিয়ে যেতেই হয়। কিন্তু রনিকে রেখে যাবার তার ইচ্ছা ছিল না। রনি তাকে যতই গালাগাল করুক, সে তার প্যাসেঞ্জার। যেখানে তার বাস থামাবার নিয়ম আছে, সেখানেই সে বাসটা থামাল এবং রনির জন্য সে অপেক্ষা করল। রনি বাসে উঠে আমার পাশে বসল। তারপর গজগজ করতে বলল, স্টুপিড ওয়েদার, স্টুপিড বাস। আই হেইট দিস, আই হেইট এভরিথিং!

রনিকে আমি বলেছিলাম আমার শহরের নাম ঢাকা। সে বলল “ডাকা”। আমি বললাম ডাকা না, ঢাকা। সে বলল তুমি স্পেল করে বল। আমি ডি-এইচ-এ-কে-এ বলার পর গম্ভীর ভঙ্গিতে সে বলে, হুম এইবার বুঝেছি। তোমার শহরের নাম হল “ডাকা” । ঢাকায় ফিরে আসার আগে রনিকে আমি বলে আসিনি। আমি গুড-বাই বলাতে খুব দুর্বল। কিছু কিছু কাজ আমার দ্বারা হয়না। চমৎকার ওয়ালথাম শহরে রনি হয়ত এখনও প্রতিদিন ড্রাইভারকে গালাগাল করতে করতে বাসে উঠছে। হয়ত আমার মত নতুন কারো দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলছে, হাই, আই অ্যাম রনি। নাইস টু মিট ইয়ু স্যার।

অতলান্তিক পেরিয়ে – পর্ব ৬
রনির সাথে আমি।

(চলবে)

সারাবাংলা/এসএসএস





Source link